কাঠমান্ডু: এভারেস্টের চেনা বরফাবৃত আকাশে তখন নামছিল জোড়া চপার।
কিন্তু মাটি ছোঁয়ার ঠিক আগের মুহূর্তেই ঘটে গেল সেই মর্মান্তিক অঘটন! অবতরণকালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শূন্যেই এক কপ্টারের ব্লেড বা রোটরের সঙ্গে সশব্দে ধাক্কা লাগল অন্যটির। মুহূর্তে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে তুষারাবৃত জমিতে ভেঙে পড়ল দুটি হেলিকপ্টারই।
মঙ্গলবার সকালে নেপালের সোলুখুম্বু জেলার ফেনিচে হেলিপ্যাডে ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় এক ভারতীয় পর্যটকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর জখম হয়েছেন নিউজিল্যান্ডের নাগরিক আরও এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যেই ভাইরাল হয়েছে সিসিটিভি-তে ধরা পড়া দুর্ঘটনার সেই হাড়হিম করা দৃশ্য। যদিও সেই ভিডিও সত্যতা যাচাই করেনি হিডেন স্টোরিজ নিউজ। পাহাড়ি প্রতিকূল আবহাওয়ায় দুই কপ্টারের এই মুখোমুখি সংঘর্ষ ও ধ্বংসলীলার খবর ছড়িয়ে পড়তেই আন্তর্জাতিক এভিয়েশন মহলে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র চাঞ্চল্য।
শূন্যে পাখা ছোঁয়াছুঁয়ি, বরফে লুটিয়ে পড়ল জোড়া চপার
রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে এভারেস্ট সংলগ্ন উচ্চ- পার্বত্য অঞ্চল সোলুখুম্বু। পর্বত আরোহী, ট্র্যাকার ও পর্যটকদের নিয়ে সেখানে নিয়মিত যাতায়াত করে ছোট হেলিকপ্টার। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার সকালে সোলুখুম্বুর খুম্বু পাসান লামু ফেনিচে হেলিপ্যাডে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল দুটি বেসরকারি সংস্থার চপার। একটি হেলিকপ্টার ছিল ‘ফিশটেল এয়ার’-এর এবং অন্যটি ‘ডায়নেস্টি এয়ার’-এর।
দুটি বিমান যখন হেলিপ্যাডের একদম কাছাকাছি, তখনই আচমকা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি কপ্টারের ঘূর্নায়মান রোটর ব্লেড গিয়ে সজোরে আঘাত করে অন্যটির পাখায়। মুহূর্তের মধ্যে দুটি চপারই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আছড়ে পড়ে নীচের বরফে। খবর পেয়েই পুলিশ ও উদ্ধারকারী দল দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
নিহত ভারতীয়, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নিউজিল্যান্ডের নাগরিক
সোলুখুম্বু জেলা পুলিশের ডিএসপি নবীনরাজ বুধাথোকি জানিয়েছেন, “দুর্ঘটনাস্থলেই এক বিদেশি পর্যটকের মৃত্যু হয়। পরে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে।” মৃত ভারতীয় পর্যটকের নাম বসন্ত কুমার বলরামরামাডু (৪৭)। উদ্ধারকাজের পর তাঁর মরদেহ কপ্টারে করে লুকলায় নিয়ে আসা হয়।
অন্য দিকে, দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হয়েছেন ৫৩ বছর বয়সী শৈলেশ কিষাণ প্যাটেল। তিনি নিউজিল্যান্ডের নাগরিক হলেও ভারতীয় বংশোদ্ভূত। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে বিমানে কাঠমান্ডুর হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। নেপাল সিভিল এভিয়েশন অথরিটির তথ্য অফিসার জ্ঞানেন্দ্র ভুল দুর্ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানিয়েছেন, পুরো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হয়েছে।
বিপজ্জনক পার্বত্য আকাশ ও পাতলা বাতাসের মারণফাঁদ
নেপাল বিশ্বজুড়ে পর্বতারোহীদের স্বর্গরাজ্য। বিশ্বের ১৪টি সর্বোচ্চ শৃঙ্গের ৮টিই এই হিমালয় কোলে অবস্থিত। পাহাড়ি খাঁজে পর্যটক বহন, রসদ সরবরাহ এবং জরুরি উদ্ধারকার্যে প্রতিদিন শত শত ছোট হেলিকপ্টার ব্যবহৃত হয়। তবে হিমালয়ের এই উচ্চতায় বিমান ও হেলিকপ্টার চালানো অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চতা যত বাড়ে, বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ ও ঘনত্বের মাত্রা তত কমতে থাকে। পাতলা বাতাসে কপ্টারের রোটর ব্লেড ধাক্কা দেওয়ার মতো যথেষ্ট বায়ুকণা পায় না, যার ফলে বিমানের ‘লিফ্ট’ বা ওড়ার ক্ষমতা অনেকটাই কমে যায়। পাশাপাশি, ইঞ্জিনের দহন প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন না থাকায় ক্ষমতার ঘাটতি দেখা দেয়। এর ওপর হঠাৎ পরিবর্তনশীল আবহাওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
উল্লেখ্য, মাত্র কয়েক দিন আগেই ভারতের উত্তরাখণ্ডের বদ্রীনাথ থেকে উড্ডয়নের পরপরই একই রকম পাতলা বাতাসের জেরে একটি হেলিকপ্টার ভেঙে পড়ে পাইলটসহ ৬ জন পুণ্যার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল।
সোলুখুম্বুর এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ফের একবার প্রমান করল, হিমালয়ের আকাশপথ ট্র্যাকারদের জন্য যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনই কতটা বিপদের!
Leave a comment