নবদ্বীপ: খাবার খাচ্ছেন নাকি বিষ খাচ্ছেন?
হোটেল এবং রেস্তোরাঁ গুলিতে পরিবেশন করা খাবারের মান ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে চলা দীর্ঘদিনের গুঞ্জনে অবশেষে সরাসরি কড়া পদক্ষেপ করল প্রশাসন! মঙ্গলবার দুপুরে নদীয়ার নবদ্বীপ শহরের একাধিক হোটেল ঝটিকা অভিযান চালাল ফুড সেফটি বা খাদ্য সুরক্ষা দফতর।
আর সেই অভিযানেই রান্নাঘরের অন্দরের যে ছবি সামনে এল, তা দেখে রীতিমতো চোখ কপালে ওঠার জোগাড় আধিকারিকদের! পচা খাবার, মেয়াদ উত্তীর্ণ খাদ্যসামগ্রী, পোড়া তেলের যত্রতত্র ব্যবহার এবং চূড়ান্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের প্রমাণ মেলায় হাতেনাতে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একাধিক গাফিলতির অভিযোগে শহরের দুটি নামী প্রতিষ্ঠানকে সাত দিন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নোটিশ ধরানো হয়েছে আরও একাধিক হোটেল ও রেস্তোরাঁকে।
মণিপুর মোড় থেকে শুরু সারপ্রাইজ ভিজিট
পূর্বঘোষণা ছাড়াই মঙ্গলবার বেলা আনুমানিক দুটো নাগাদ নবদ্বীপের মণিপুর মোড় সংলগ্ন এলাকা থেকে অভিযান শুরু করেন খাদ্য সুরক্ষা দফতরের আধিকারিকেরা। প্রথমে একটি হোটেলে হানা দিয়ে একাধিক অনিয়ম ও অসঙ্গতি দেখতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষকে নোটিশ ধরা হয়। এরপর একে একে পার্শ্ববর্তী এলাকার অন্য একটি রেস্তোরাঁ ও হোটেলের রান্নাঘরে পা রাখতেই চক্ষু চড়কগাছ হয় পরিদর্শকদের।
আরও পড়ুন: ‘মানিককোড়া কালী’! ডাকাতদের পুজো থেকে আজকের জাগ্রত দেবী!
রান্নাঘরের চারধারে নোংরা আবর্জনা, পচে যাওয়া খাদ্যসামগ্রী এবং বারবার ব্যবহার করার ফলে কালো হয়ে যাওয়া পোড়া তেলের জার উদ্ধার করেন আধিকারিকরা। শুধু তা-ই নয়, একটি বড় রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রে তো তাদের ফুড সেফটি লাইসেন্সের মেয়াদ পর্যন্ত অনেক আগেই ফুরিয়ে গিয়েছে বলে নজরে আসে। অবিলম্বে ওই সমস্ত ক্ষতিকারক ও পচা সামগ্রী বাজেয়াপ্ত করে ধ্বংস করা হয় এবং কড়া ভাষায় সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।
বন্ধ রাখার নির্দেশ ও মালিকপক্ষের সাফাই
অভিযান শেষে খাদ্য সুরক্ষা দফতরের এক শীর্ষ আধিকারিক জানান, ‘‘এদিন মোট চার থেকে পাঁচটি হোটেল ও খাবারের দোকানে রুটিন চেক-আপ চালানো হয়েছে। কয়েকটি জায়গায় রান্নাঘরের অবস্থা এতটাই শোচনীয় ছিল যে তা মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে চরম বিপজ্জনক। কোথাও পচা খাবার তো কোথাও পোড়া তেল পাওয়া গিয়েছে। আপাতত দুটি প্রতিষ্ঠানকে সাত দিনের জন্য পুরোপুরি বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রত্যেককে নোটিশ দিয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই কদিনের মধ্যে সমস্ত ত্রুটি সংশোধন না করলে আরও কঠোর আইনি পদক্ষেপ করা হবে।’’
অন্যদিকে, প্রশাসনের এই কড়া পদক্ষেপের মুখে পড়ে সাফাই গাইতে শুরু করেছেন অভিযুক্ত ব্যবসায়ীরা। বন্ধ রাখার নির্দেশ পাওয়া একটি পুরোনো রেস্তোরাঁর মালিকের দাবি, তাঁরা প্রায় কুড়ি বছর ধরে সুনামের সঙ্গে এই ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং বর্তমানে সেখানে ১০ জন কর্মী কাজ করছেন। তাঁর বক্তব্য, মূলত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত কিছু নির্দেশ দিয়ে সাত দিন দোকান বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। তবে তাঁর দাবি, রান্নাঘরে কোনো মেয়াদ উত্তীর্ণ বা পচা খাবার পাওয়া যায়নি এবং কোনো সামগ্রী বাজেয়াপ্তও করা হয়নি।
জনস্বাস্থ্য রক্ষায় লাগাতার নজরদারির হুঙ্কার
উৎসবের মরশুম হোক কিংবা দৈনন্দিন জীবন, শহরের অলিগলিতে গড়ে ওঠা হোটেল বা রেস্তোরাঁর খাবারের মান ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে বহু দিন ধরেই ক্রেতাদের মনে নানা অসন্তোষ ও অভিযোগ ছিল। নবদ্বীপের মতো ঐতিহাসিক ও জনবহুল শহরে ফুড সেফটি দপ্তরের এই হঠাৎ হানা এবং কড়া হাতে দুটি প্রতিষ্ঠান সিল করে দেওয়ার ঘটনা শহরজুড়ে এক বিরাট চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের সঙ্গে আপস করার বিন্দু মাত্র সুযোগ নেই। নবদ্বীপের সমস্ত হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলিকে কড়া নিয়মের আওতায় আনতে আগামী দিনেও এই ধরনের অভিযান ও নজরদারি অবিরাম ও নিয়মিতভাবে জারি থাকবে।
Leave a comment