কলকাতা: তুষারশুভ্র হিমালয়ের কোলে ঘুরতে গিয়ে চরম বিপর্যয়ের মুখে বাংলার পর্বতপ্রেমীরা! উত্তরাখণ্ডের দুর্গম কেদারতাল এলাকায় ট্রেকিংয়ে গিয়ে আচমকা তুষারঝড়ের মুখে পড়ে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছেন বাঁকুড়ার পাঁচ বাসিন্দা-সহ মোট আট জন অভিযাত্রী।
গত পাঁচ দিন ধরে হাড়হিম করা ঠান্ডায় দুর্গম পাহাড়ি খাদ ও বরফের স্তূপে উদ্ধারকারী দল এবং হেলিকপ্টার নিয়ে চিরুনি তল্লাশি চালাচ্ছে উত্তরাখণ্ড প্রশাসন। মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত তুষারধসের বরফ সরিয়ে এক মহিলা ও এক পুরুষের নিষ্প্রাণ দেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া জোড়া দেহ বাঁকুড়ার নিখোঁজদের কারও কি না, তা নিয়ে এখনও চরম ধোঁয়াশা বজায় রয়েছে। এই ঘটনায় বাংলাজুড়ে তৈরি হয়েছে এক গভীর শোকের ছায়া ও উৎকণ্ঠা। উত্তরাখণ্ড পুলিশের রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (SDRF) এবং নেহরু ইনস্টিটিউট অফ মাউন্টেনিয়ারিং (NIM)-এর অভিজ্ঞ উদ্ধারকারী দল যৌথভাবে হাড়কাঁপানো প্রতিকূল আবহাওয়ার তোয়াক্কা না করেই অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে খারাপ আবহাওয়া বাধা হয়ে দাঁড়ানোয় মঙ্গলবারের মতো তল্লাশি স্থগিত রেখে বিকেল তিনটে নাগাদ বেস ক্যাম্পে ফিরে আসতে হয়েছে উদ্ধারকারীদের। বুধবার সকাল থেকে ফের নতুন উদ্যোগে তল্লাশি শুরু হবে বলে জানা গিয়েছে।
আনন্দের সফর কীভাবে পরিণত হলো ট্র্যাজেডিতে?
উত্তরাখণ্ড জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ২৭ অক্টোবর গঙ্গোত্রী থেকে কেদারতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল ১২ জনের একটি অভিযাত্রী দল। যে দলে ছিলেন সাত জন সাধারণ পর্যটক, এক জন গাইড, এক জন রাঁধুনি এবং তিন জন স্থানীয় পোর্টার।
যাত্রার শুরুতে আবহাওয়া সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও মনোরম থাকলেও, গত ২৯ অক্টোবর থেকে আবহাওয়ার দ্রত অবনতি হতে শুরু করে। পর্বত শিখরে আচমকাই আছড়ে পড়ে এক প্রলয়ঙ্কর তুষারঝড়। পাহাড়ের উঁচু খাঁজ বেয়ে নেমে আসে একের পর এক তুষারধস।
ঘটনার আকস্মিকতায় দিশাহারা হয়ে পড়েন সবাই। দুর্গম রুটেই চার জন কোনোমতে জীবন বাঁচিয়ে ফিরতে পারলেও তুষারধসের নিচে চাপা পড়েন বাকি আট জন। দুর্ঘটনায় নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন বাংলার বাঁকুড়া জেলার তাপস বাউড়ি, রতন ঘোষ, মনোজ খোভাস, রিন্টু মণ্ডল ও উদয় ঘোষ। এ ছাড়াও ওই দলে ছিলেন উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা বর্তিকা বর্মা এবং উত্তরকাশীর স্থানীয় বাসিন্দা সিদ্ধার্থ রানা ও এক জন গাইড। নিখোঁজদের প্রত্যেকের বয়স ২৩ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে।
হাড়হিম করা তল্লাশি ও উৎকণ্ঠায় বাঁকুড়া
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই উত্তরাখণ্ড প্রশাসনের নির্দেশে উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর চেষ্টা করে। কিন্তু দৃশ্যমানতা কমে যাওয়া এবং টানা তুষারপাতের জেরে প্রথমে উদ্ধারকাজ স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। পরবর্তী সময়ে হেলিকপ্টার নামিয়ে ও সেনার বিশেষ সাহায্য নিয়ে শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টা নাগাদ উত্তরকাশী জেলা প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে জোড়া দেহ উদ্ধারের কথা নিশ্চিত করে।
এদিকে ঘটনার খবর পৌঁছাতেই বাঁকুড়ায় নিখোঁজদের পরিবারে কান্নার রোল উঠেছে। প্রিয়জনদের জীবিত ফিরে পাওয়ার শেষ আশায় দিন গুনছেন স্বজনেরা। নবান্নের তরফেও উত্তরাখণ্ড প্রশাসনের সঙ্গে অনবরত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলে খবর। বরফের চাদরে ঢাকা কেদারতালের হিমশীতল খাঁজে অলৌকিক কিছুর অপেক্ষায় এখন প্রহর গুনছে পুরো বাংলা।
Leave a comment