কলকাতা: বহুবছর ধরে সারান্ডার দুর্ভেদ্য জঙ্গলে মাওবাদী কার্যকলাপের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিলেন তাঁরা। মাথায় ছিল মোট ৭ লাখ টাকার বিপুল ইনাম। অবশেষে সমস্ত রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের পথ ছেড়ে মূল স্রোতে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলেন মোস্ট ওয়ান্টেড মাওবাদী দম্পতি মঙ্গল এবং মালতী। শুক্রবার সকালে লালবাজারে কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দার কাছে নিজেদের স্বয়ংক্রিয় একে-৪৭ ও ইনসাস রাইফেল সমর্পণ করে আত্মসমর্পণ করেন তাঁরা।
পশ্চিমবঙ্গের মাওবাদী আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই দুই নাম। মঙ্গলের বাড়ি পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনিতে এবং মালতী ঝাড়গ্রামের গোপীবল্লভপুরের বাসিন্দা। ২০১০ সালে শালবনিতে জনসাধারণের কমিটির মাধ্যমে সংগঠনে পা রাখেন মঙ্গল। পরবর্তীতে জঙ্গলমহলের শীর্ষ মাওবাদী নেতা কিষেণজির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন তিনি। ২০১১-১২ সালে কিষেণজির মৃত্যুর পর তাঁরা স্থানান্তরিত হন ঝাড়খণ্ডের সারান্ডা ও দলমা অঞ্চলের গভীর জঙ্গলে। কিন্তু ২০২৬ সাল নাগাদ কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশের যৌথ অভিযানের মুখে পড়ে সারান্ডায় মাওবাদীদের টিকে থাকা কার্যত অসম্ভব হয়ে ওঠে। প্রাণ বাঁচাতে সারান্ডা ছাড়েন ১৩ জন শীর্ষস্থানীয় মাওবাদী সদস্য, যাঁদের মধ্যে ছিলেন এই দম্পতিও।
ঝাড়খণ্ড পুলিশের কাছে মঙ্গলের মাথার দাম ছিল ৫ লক্ষ টাকা এবং মালতীর মাথার দাম ছিল ২ লক্ষ টাকা। একাধিক নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য মঙ্গলের বিরুদ্ধে ঝাড়খণ্ডে অন্তত ৬ থেকে ৭টি গুরুতর মামলা ঝুলছিল। দীর্ঘদিন গা-ঢাকা দিয়ে থাকার পর অবশেষে তাঁরা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে আত্মসমর্পণের পথ বেছে নেন। আত্মসমর্পণ করার পর মঙ্গল স্পষ্ট ভাষায় জানান, সশস্ত্র হিংসা ও বন্দুকের নলের মাধ্যমে সমাজের কোনো স্থায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। সেই উপলব্ধি থেকেই তাঁরা এই ভুল পথ পরিত্যাগ করে সাধারণ মানুষের মতো বাঁচার তাগিদে সরকারের কাছে ফিরে এসেছেন।
কলকাতা পুলিশের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, সম্প্রতি একের পর এক শীর্ষ মাওবাদী নেতার পতনে ভেঙে পড়েছে তাঁদের নেটওয়ার্ক। চলতি বছরের জুনেই মাওবাদী নেত্রী পুষ্পা ওরফে শকুন্তলা আত্মসমর্পণ করেছিলেন লালবাজারে। তার ঠিক আগেই উত্তর কাশীপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বর্ষীয়ান মাওবাদী নেত্রী শ্রদ্ধা বিশ্বাস ওরফে বেলাকে। পরপর এতগুলো ধাক্কায় বাংলায় মাওবাদী নেটওয়ার্কের কোমর পুরোপুরি ভেঙে গিয়েছে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। এই আত্মসমর্পণের মাধ্যমে জঙ্গলমহলে মাওবাদী অধ্যায়ের যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল, তা বলাই বাহুল্য।

শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ অক্টোবর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন