নিউ ইয়র্ক: রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভার ৮১তম অধিবেশনে দ্বিপাক্ষিক তরজা এবার চূড়ান্ত উত্তেজনায় পৌঁছে গেল। উসকানি দিতে এসে বিশ্বমঞ্চেই ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল পাকিস্তান। কাশ্মীর ইস্যু উসকে দিয়ে এবং জঙ্গি মদতপুষ্ট নীতি আড়াল করার শেষ চেষ্টা করেছিলেন পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। কিন্তু ভারতের কূটনীতিক পেটেল গেহলট এবং বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের জোড়া আক্রমণে কার্যত ছারখার হয়ে গেল ইসলামাবাদ। ভারতের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, সীমান্ত পারের সন্ত্রাসবাদ কোনও ভাবেই বরদাস্ত করা হবে না, আর এর মাশুল পাকিস্তানকে গুনতেই হবে।
শুক্রবার সাধারণ সভায় নিজের ২৩ মিনিটের ভাষণে পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে কাশ্মীর প্রসঙ্গ তোলেন পাক প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের সংঘাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতার দাবি তুলে নিজেদের আড়াল করার চেষ্টা করেন। জবাবে ভারত তার ‘রাইট টু রিপ্লাই’ অধিকার প্রয়োগ করে পাক বয়ানকে এক হাত নেয়। ভারতীয় তরুণ কূটনীতিক পেটেল গেহলট অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ভাষায় মনে করিয়ে দেন, ৯/১১ হামলার মূল রূপকার ওসামা বিন লাদেন কোথায় আশ্রয় পেয়েছিল। তিনি বলেন, “আমেরিকা যখন ৯/১১-র বর্ষপূর্তি পালন করছে, তখন বিশ্বের মনে রাখা উচিত ওই মারণ হামলার মাস্টারমাইন্ডকে কোথায় পাওয়া গিয়েছিল। পাকিস্তানের সেনা অ্যাকাডেমির ঠিক দরজায়!”
এই দুমুখো নীতিকে ধিক্কার জানিয়ে ভারতের প্রতিনিধি আরও জানান, পাকিস্তান দিনে সুরক্ষার বাণী ঝাড়ে আর রাতে সীমান্ত পার করে জঙ্গি পাঠায়। গত বছর এপ্রিলের পাহালগাম হামলায় ২৬ জন নির্দোষ মানুষের মৃত্যুর জবাবে ভারতের চালানো ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে পেটেল স্পষ্ট জানান, “আমরা গত বছরই প্রমাণ করেছি, সন্ত্রাসবাদীদের লুকিয়ে থাকার কোনও জায়গা নেই। আত্মরক্ষার অধিকার ভারতের আছে এবং পাকিস্তানের এই লাগাতার জঙ্গি তোষণ যে কড়া পরিণাম ডেকে আনবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।” সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত যে পাক সন্ত্রাসবাদের কড়া জবাব, তাও পরিষ্কার করা হয়।
অন্য দিকে, পাক প্রশাসনের অন্দরের প্রকৃত ছবিটা বিশ্বের সামনে উন্মুক্ত করে ভারত জানায়, পাকিস্তান হলও “সেনার দ্বারা, সেনার মাধ্যমে এবং সেনার জন্য” চলা এক রাষ্ট্র। সেখানে জনপ্রতিনিধিরা কেবল পুতুল, আসল সুতো থাকে সেনাবাহিনীর হাতেই। একই সঙ্গে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের রাওয়ালকোটে সাধারণ মানুষের ওপর নির্মম অত্যাচার ও বালোচিস্তানের চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্রটি তূলে ধরে পাক প্রধানমন্ত্রীকে তীব্র আক্রমণ করা হয়। পাক সরকারের সংখ্যালঘু নিপীড়ন ও ধর্মনিন্দা আইনের অপব্যবহারের ইতিহাসও বিশ্বমঞ্চে বিশ্বস্ততার সঙ্গে তুলে ধরে নয়াদিল্লি।
তবে দিনের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্তটি তৈরি হয় জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের মুখোমুখি এক পাক সাংবাদিকের প্রশ্নে। ভারতীয় বিদেশমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে যখন এক পাক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ভারত কবে পাকিস্তানে ‘সন্ত্রাসবাদ ছড়ানো’ বন্ধ করবে? মুহূর্তের জন্য থমকে যান জয়শঙ্কর। তার পরই স্বভাবসিদ্ধ কড়া ভাষায় পাল্টা ধমক দিয়ে বলেন, “একটা সন্ত্রাসবাদী দেশ আমাকে এই প্রশ্ন করছে?” এই এক কথায় গোটা কক্ষের মধ্যে অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে আসে।
রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার কাউন্সিলেও পাকিস্তানের অর্থনৈতিক কঙ্কালসার অবস্থা সামনে এনে কটাক্ষ ছুঁড়ে দেন ভারতীয় কূটনীতিক ক্ষিতিজ ত্যাগী। ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘোরা পাকিস্তান অন্য দেশের জমি দখলের স্বপ্ন না দেখে আগে দেশের ঋণের বোঝা মেটাক বলে তিনি কড়া বার্তা দেন। সামগ্রিক বিচারে, নিউ ইয়র্কের বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তান যতবারই ভারতের ওপর কাদা ছেটাতে এসেছে, ততবারই ভারতের যৌথ কূটনৈতিক প্রত্যাঘাতে মারাত্মক কোণঠাসা হয়ে মুখ পুড়েছে ইসলামাবাদের।

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন