ওয়াশিংটন: এক দিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বাণিজ্য যুদ্ধ নিয়ে সংঘাত। অন্য দিকে ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং তাইওয়ানকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা। এই চরম টানাপোড়েনের আবহেই দীর্ঘ এক দশক পর মার্কিন মাটিতে পা রাখলেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ওয়াশিংটনের অদূরে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজ বায়ুসেনা ঘাঁটিতে নেমে বিমান থেকেই শি-কে বিশেষ অভ্যর্থনা জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
রাষ্ট্রপ্রধানদের বিমানবন্দর থেকে স্বাগত জানানোর প্রথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিরল হলেও, লাল কার্পেট সংবর্ধনা এবং বি-১ বোমারু বিমানের ‘ফ্লাইপাস্ট’ দিয়ে শি-কে অভ্যর্থনা জানান ট্রাম্প। কিন্তু এই চোখধাঁধানো আড়ম্বরের আড়ালেও মূল প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। আগামী দিনে ট্রাম্পের কড়া শুল্ক নীতি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জটিলতা মেটাতে আদৌ কতটা সফল হবে দুই পরাশক্তি? আর দুই দেশের এই আপাত ‘বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি’ দক্ষিণ এশিয়ায় দিল্লির কূটনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে সাউথ ব্লকে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা।
শি জিনপিংয়ের সফরের শুরুতেই মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ঘোষণা করেছেন, দু’দেশের মধ্যকার সাময়িক বাণিজ্য-বিরতির মেয়াদ আরও দুই মাস বাড়িয়ে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়াতে সম্মত হয়েছে ওয়াশিংটন ও বেজিং।
আগামী বছরের শুরুতেই শুল্ক নিয়ে নতুন এক দফায় চূড়ান্ত ডেডলাইন তৈরি হলেও আপাতত বাণিজ্য ক্ষেত্রে স্থিতাবস্থা বজায় থাকছে। ট্রাম্পের প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদের অন্যতম মূল অস্ত্র ছিল চিনা পণ্যে তিন অঙ্কের শুল্ক চাপানোর হুমকি। সেই কড়া শুল্ক নীতির মুখে দাঁড়িয়ে গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে ট্রাম্প-শি বৈঠকের পর যে সাময়িক স্বস্তি এসেছিল, তা আরও কিছু দিন স্থায়ী হলো। তবে এ শুধুই সময়ের খেলা কি না, তা নিয়ে সন্দিহান আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।
রাষ্ট্রসংঘ বা ব্রিকস (BRICS)-এর শীর্ষ সম্মেলনের পর বিশ্ব রাজনীতির ভরকেন্দ্র এখন ওয়াশিংটনে ট্রাম্প-শি দ্বিপাক্ষিক আলোচনার দিকে। আমেরিকা ও চিনের মধ্যে এই বাণিজ্যিক সমঝোতা ও নমনীয়তা ভারতের কৌশলগত অবস্থানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সম্প্রতি ট্রাম্পের আগ্রাসী শুল্ক নীতি ভারতীয় রপ্তানির ক্ষেত্রেও বড়সড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। অন্যদিকে ব্রিকস মঞ্চে চিনের প্রভাববৃদ্ধি ও মস্কো-বেজিং-তেহরান অক্ষের সঙ্গে মার্কিন দ্বন্দ্ব ভারতের ভারসাম্য বজায় রাখার কূটনীতিকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলছে।
যদি ওয়াশিংটন ও বেজিং নিজেদের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা প্রযুক্তিগত বাণিজ্যে কোনো গোপন বোঝাপড়ায় পৌঁছায়, তবে তা ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে (Indo-Pacific) ক্ষমতার সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে ইরানের যুদ্ধে বেজিং মার্কিন বিরোধীদের পরোক্ষ মদত দিচ্ছে বলে আমেরিকার অন্দরে যে ক্ষোভ রয়েছে, তার ওপর ট্রাম্প কতটা নরম থাকেন, সে দিকেও সাউথ ব্লক নজর রাখছে।
চিনের প্রেসিডেন্ট এই সফরে মার্কিন ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তিবিদদের সঙ্গে বৈঠক করবেন, যদিও তাঁর প্রতিনিধিদলে কোনো চিনা সিইও-কে রাখা হয়নি। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, ২০২৯ সালে ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত বেজিং মূলত সময় কেনার কৌশল নিয়েছে। তবে হোয়াইট হাউসের এই পাঁচতারা অভ্যর্থনা ট্রাম্পকে ঘরোয়া রাজনীতিতেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
মার্কিন সেনেটের সশস্ত্র পরিষেবা কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার কটাক্ষ করে বলেছেন, "আমাদের মনে রাখা উচিত অতিথি এক একনায়কশাসক।" সব মিলিয়ে, শুল্ক যুদ্ধ সাময়িক থমকে থাকলেও ট্রাম্প-শি বৈঠক ঘিরে বৈশ্বিক কূটনীতির যে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, তার রেশ যে দিল্লি পর্যন্ত পৌঁছাবে, তা একপ্রকার নিশ্চিত।

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন