কলকাতা: দশমীর সকাল মানেই এখন শুধু বিসর্জনের প্রস্তুতি নয়! সাদা-লাল শাড়ি, গয়না, হাতে সিঁদুর… তারপর একের পর এক ফটোশুট, রিল, আর সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘সিঁদুর খেলা’ মোমেন্ট! এযুগে পুজোর শেষ দিনটাতে মনে বিষাদের ছায়া থাকলেও যেন প্রত্যেকটা মুহূর্ত ক্যামেরায় আটকে রাখতে ব্যস্ত সবাই।
দশমী মানেই ঢাকের শেষ বোল, দেবীকে বিদায় আর মণ্ডপজুড়ে সিঁদুরের লাল রং। কিন্তু একটা প্রশ্ন কখনও ভেবে দেখেছেন? দুর্গাপুজোর এতগুলো দিনের মধ্যে সিঁদুর খেলার জন্য দশমীকেই বেছে নেওয়া হল কেন? আর কবে থেকেই বা এই রীতি চলে আসছে?
আজকের দিনে সিঁদুর খেলা মানেই লাল পাড় সাদা শাড়ি, সাজগোজ, ছবি আর রিল। কিন্তু এই রীতির গল্পটা শুধুই সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ড নয়। এর পিছনে রয়েছে বাংলার পুরনো পারিবারিক পুজো এবং বিবাহিত মহিলাদের নানা লোকাচারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটা দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাস।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, দশমীর দিন দেবী দুর্গাকে সিঁদুর পরিয়ে তারপর বিবাহিত মহিলারা একে অপরকে সিঁদুর দেন। দেবীকে দেওয়া হয় স্বামীর দীর্ঘায়ু ও সংসারের মঙ্গলের প্রার্থনা। তারপর সেই সিঁদুরই ছুঁয়ে যায় অন্য মহিলার কপাল, গাল, শাঁখা-পলা—অর্থাৎ শুভকামনা ছড়িয়ে পড়ে একে অপরের মধ্যে।
কিন্তু মজার বিষয় হল, আজ যে ভাবে বড় বড় বারোয়ারি পুজোয় সিঁদুর খেলা দেখা যায়, শুরু থেকেই কিন্তু ছবিটা এমন ছিল না।বাংলার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোতেই এই ধরনের রীতির চর্চা বেশি দেখা যেত। সময়ের সঙ্গে সেই পারিবারিক আচার ধীরে ধীরে সর্বজনীন পুজোর অংশ হয়ে ওঠে।
আর এখানেই বদলে যায় সিঁদুর খেলার চরিত্রও। একসময় যেখানে বিষয়টা ছিল মূলত ধর্মীয় ও পারিবারিক রীতির মধ্যে, এখন সেখানে যোগ হয়েছে ফ্যাশন, ফটোগ্রাফি এবং সোশ্যাল মিডিয়া। দশমীর সকালে তাই অনেকেই আগে থেকেই ঠিক করে রাখেন—কোন শাড়ি, কী গয়না, কীভাবে সাজবেন, আর কোথায় হবে সেই ‘পারফেক্ট’ সিঁদুর খেলার ছবি!
তবে ইতিহাসের একটা জায়গা আজও একই রয়ে গিয়েছে—সিঁদুরের এই লাল রং আসলে বিদায়ের রংও। দেবীকে সিঁদুর পরিয়ে, নিজেরাও সিঁদুরে রাঙিয়ে নেওয়ার পরই শুরু হয় বিসর্জনের প্রস্তুতি। আনন্দের মধ্যেও তখন চলে আসে মনখারাপ।
তাই আজকের সিঁদুর খেলা যতই রিল, ছবি আর ফ্যাশনের অংশ হয়ে উঠুক না কেন, তার ভিতরে এখনও লুকিয়ে আছে বাংলার পুরনো পুজোর সংস্কৃতি—দেবীকে বিদায় জানানোর আগে শুভকামনা, মঙ্গল আর একে অপরের সঙ্গে সেই আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার এক ঐতিহ্য।

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন