কলকাতা: শালবনি জমি কেলেঙ্কারি মামলায় সিআইডি তদন্তের জল এবার আরও ঘোলা হতে শুরু করেছে। রাজ্য রাজনীতির অলিন্দে শোরগোল ফেলে ফের নিজের বয়ান বদল করলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত আপ্ত সহায়ক (পিএ) সুমিত রায়।
সিআইডি-র জেরায় এতদিন যাঁকে কেন্দ্র করে তদন্ত এগোচ্ছিল, সেই গতিপথ হঠাৎই অন্যদিকে মোড় নিল। এতদিন তৃণমূল সাংসদের নির্দেশ বা ভূমিকার কথা সিআইডি সূত্রে উঠে এলেও, সুমিতের আইনজীবীর দাবি অনুযায়ী, দলীয় অ্যাকাউন্টে টাকা জমার মূল নির্দেশদাতা আদতে তৃণমূলের প্রাক্তন কোষাধ্যক্ষ অরূপ বিশ্বাস।
রবিবার ভবানীভবনে সিআইডি দফতরে সুমিত রায়ের সঙ্গে দেখা করতে যান তাঁর আইনজীবী অগ্নিশ বসু। সেখান থেকে বেরিয়েই সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে এক বিস্ফোরক দাবি করেন তিনি। আইনজীবী জানান, “আমি সুমিতদাকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, সিআইডির প্রশ্নের উত্তরে তিনি কী বলেছেন? ওঁর বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট ও সরল। দলের যাবতীয় অর্থনৈতিক কাজকর্ম দলের কোষাধ্যক্ষই পরিচালনা করেন। ২০২০ সালের পর থেকে দলের সেই পদে ছিলেন অরূপ বিশ্বাস। এটা তৃণমূলের দলীয় সংবিধানেও পরিষ্কার বলা রয়েছে। তাই ট্রেজারার যেভাবে নির্দেশ দিতেন, সুমিতবাবু ঠিক সেভাবেই টাকা জমা করতেন বা লেনদেন চালাতেন।”
আইনজীবীর এই মন্তব্যের পরই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, তবে কি এতদিনের সিআইডি তদন্তের গতিমুখ বদলে যাওয়ার মুখে? কারণ, সুমিতকে জেরা করে ইতিপূর্বে সিআইডি যে তথ্য আদালতে পেশ করেছিল, তা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তদন্তকারী সংস্থার আগের দাবি অনুযায়ী, শালবনি এলাকায় খাস সরকারি জমির ভুয়ো নথি তৈরি করে কোটি কোটি টাকায় বিক্রির যে চক্রান্ত চলছিল, সেই কেলেঙ্কারির বিপুল অর্থ হস্তান্তরিত হত সরাসরি সুমিতের অফিসে।
এই মামলায় রাজ্য পুলিশ প্রথমে গ্রেফতার করেছিল প্রাক্তন বিধায়ক সুজয় হাজরাকে। সুজয়কে জেরার পর এবং তাঁর গাড়ির চালকের বয়ানের সূত্র ধরে তদন্তকারীরা পৌঁছে যান কালীঘাটে অভিষেকের বাসভবনে।
সেখান থেকেই সিআইডি গ্রেপ্তার করে সুমিতকে। অভিষেকের দুই ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর বয়ানকেও এই মামলায় মূল হাতিয়ার করে সিআইডি। চার্জশিটে স্পষ্ট জানানো হয়েছিল, সুজয়ের হাত ধরে কাটমানি ও দুর্নীতি চক্রের টাকা পৌঁছে যেত সুমিতের কাছে।
শুধু তা-ই নয়, এই বিপুল টাকার উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে সুমিতকে দফায় দফায় জেরা করেন তদন্তকারী আধিকারিকরা। সিআইডি আদালতে পেশ করা নথিতে আগে দাবি করেছিল, সুমিত জেরায় স্বীকার করেছেন যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশেই ‘টি ঘোষ’ নামে এক ব্যক্তি তাঁর কাছে কোটি কোটি টাকা পৌঁছে দিতেন। ওই ব্যক্তিকে আদালতে সাংসদের ‘কোষাধ্যক্ষ’ হিসেবেও উল্লেখ করেছিল সিআইডি।
তবে রবিবারের ঘটনার পর সেই পুরো তদন্ত চিত্রপট এক ঝটকায় বদলে গেল। এতদিন যেখানে অভিষেক এবং তাঁর দফতরের নির্দেশ নিয়ে সিআইডি একের পর এক চাঞ্চল্যকর দাবি পেশ করছিল, সেখানে সুমিতের আইনজীবী সরাসরি অরূপ বিশ্বাসের নাম টেনে আনায় অস্বস্তি বাড়ল ঋতব্রত তৃণমূল শিবিরের।
একদিকে সরকারি জমি জালিয়াতির কোটি কোটি টাকা, অন্যদিকে দলীয় সংবিধান উদ্ধৃত করে প্রাক্তন ট্রেজারারের ঘাড়ে দায়িত্ব ঠেলে দেওয়া, দুইয়ের চাপে জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে শালবনি কাণ্ড। সিআইডির আঁতশকাচের নিচে থাকা এই মামলায় আগামী দিনে আর কার কার নাম উঠে আসে এবং আইনি জল কত দূর গড়ায়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
বিষয় : HiddenStoriesNews

সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন