নয়াদিল্লি: দেশের তরুণ ক্রীড়াবিদদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সওয়াল করতে গিয়ে গর্জে উঠলেন জোড়া অলিম্পিক পদকজয়ী পিভি সিন্ধু! সদ্য সমাপ্ত ইউরোপীয় ট্যুরে ভারতীয় ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়দের টাকা কমিয়ে প্রতিযোগিতা অংশ নেওয়া এবং কোচেদের অনুপস্থিতি নিয়ে স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (সাই)-র সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করলেন তিনি।
স্পষ্ট ভাষায় সিন্ধু জানিয়ে দিলেন, অ্যাথলেটদের আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাঠানোর অর্থ জোগানো ব্যবস্থার ‘রক্তচুষে নেওয়া’ বা অপচয় নয়; বরং তা দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য এক অনবদ্য ‘বিনিয়োগ’!
সম্প্রতি ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, ফ্রান্স এবং জার্মানির টানা চারটি টুর্নামেন্টে সাই (SAI) ভারতের ব্যাডমিন্টন দলকে আর্থিক অনুদান দিতে অস্বীকার করায় বিতর্ক তুঙ্গে ওঠে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই জার্মানির হাইলো ওপেনে যথাক্রমে মহিলা ও পুরুষ সিঙ্গলসে খেতাব জেতেন পিভি সিন্ধু এবং লক্ষ্য সেন। তার পরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন ভারতের এই তারকা শাটলার।
উইম্বলডন বনাম ব্যাডমিন্টন: বৈষম্যের হিসেব
এক নেটিজনের পোস্টের জবাবে সিন্ধু পেশাদার ব্যাডমিন্টন ও অন্যান্য খেলার মধ্যে বিপুল আর্থিক বৈষম্যের নির্মম চিত্র তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, “পেশাদার ব্যাডমিন্টনের আসল সত্যটা অনেকেই বোঝেন না। উইম্বলডনের প্রথম রাউন্ডে হেরে বিদায় নিলেও পাওয়া যায় ৮০ হাজার পাউন্ড (প্রায় ৯০ লক্ষ টাকা)। আর ব্যাডমিন্টনের সবচেয়ে দামি টুর্নামেন্ট চায়না ওপেন জিতলে মেলে ১ লক্ষ ৪০ হাজার ডলার। প্রথম রাউন্ডে হেরে গেলে? মাত্র ২ হাজার ডলার! অথচ দু’ক্ষেত্রেই কিন্তু বিমানভাড়া, কোচ, ফিজিও, ট্রেনারদের থাকা-খাওয়ার খরচ একই থাকে। এই বৈষম্য নিয়ে আমার সাথে রোহান বোপান্নার দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমি স্বীকার করি প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড়দের স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করা উচিত। আমি ভাগ্যবান যে কিছু ভালো স্পনসর পেয়েছি। কিন্তু সবার সেই সৌভাগ্য থাকে না। সেই কারণেই OGQ (ওপেন গ্রাউন্ডস ফাউন্ডেশন)-এর মতো সংস্থার গুরুত্ব এত বেশি।”
“কোচ ছাড়া লড়ছে ১৮ বছরের তরুণী…”
এই ইউরোপীয় সফরে ভারতীয় ব্যাডমিন্টনের করুণ চিত্রটি বারবার স্পষ্ট হয়েছে। ফরাসি ওপেনে আকানে ইয়ামাগুচিকে হারানোর সময় অস্মিতা চালিহাকে সাহায্য করতে কোর্টের সাইডলাইনে বসতে হয়েছিল সতীর্থ শাটলার ইশারানী বারুয়াকে! আবার ডেনমার্ক ওপেনের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পরেও কোচ ছাড়াই একক লড়াই চালাতে হয়েছিল একরত্তি তানভি শর্মাকে।
এই ঘটনাগুলি উল্লেখ করে অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রশ্ন তুলেছেন সিন্ধু, “অনেক তরুণ খেলোয়াড় কোচ ছাড়াই খেলতে বাধ্য হয়েছে, কেউ কেউ তো টুর্নামেন্ট থেকে নাম তুলে নিতে বাধ্য হয়েছে। আমি না হয় নিজের পকেটের টাকায় সফর কভার করে নেব। কিন্তু যে ১৮ বছরের তরুণী চোখের কোণে স্বপ্ন নিয়ে পরবর্তী ‘সিন্ধু’ বা ‘লক্ষ্য’ হতে চাইছে, তার কী হবে? অ্যাথলেটদের পাশে দাঁড়ানো কোনো ব্যবস্থার অপচয় নয়, ওটা ভারতের ভবিষ্যৎ ক্রীড়াবিদদের তৈরি করার বিনিয়োগ।”
তবে সরকারের অতীত অবদানের কথা স্মরণ করে সিন্ধু স্পষ্ট করেন, “ভারত সরকার ও ‘সাই’ বছরের পর বছর ধরে অ্যাথলেটদের যেভাবে সাহায্য করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। স্বচ্ছতা নিশ্চয়ই দরকার, কিন্তু সেই চক্করে যেন উদীয়মান অ্যাথলেটদের স্বপ্ন জলাঞ্জলি না যায়।”
আরও পড়ুন: নজরে সেই রো-কো! প্রথম একদিনের আগে বড় ঘোষণা গিলের
সময়ের গেরোয় সাই (SAI)-এর সাফাই
এদিকে এই বিতর্কের মুখে নিজেদের দায় এড়াতে ব্যাডমিন্টন অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া (BAI)-র ওপর দায় চাপিয়েছে সাই। সাই সূত্রের দাবি, নতুন নিয়ম অনুযায়ী যে কোনো টুর্নামেন্টের অন্তত ৩০ দিন আগে খেলোয়াড়দের নামসহ যাবতীয় খরচের আবেদন জমা দিতে হয়। কিন্তু বিএআই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই আবেদনপত্র জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
সাই-এর এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, “আগে ৯০ দিন বা ৬০ দিন আগে আবেদনের নিয়ম ছিল। ফেডারেশনের সুবিধার কথা ভেবে সেই সময়সীমা কমিয়ে ৩০ দিন করা হয়। তাও যদি বিএআই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নাম না পাঠায়, তবে নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী ফান্ড পাস করা সম্ভব নয়। জাতীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলিকেও দায়িত্বশীল হতে হবে।”
ফেডারেশনের প্রশাসনিক গাফিলতি আর কেন্দ্রীয় ক্রীড়া মন্ত্রকের কঠোর নিয়মকানুনের জাঁতাকলে পড়ে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছে ভারতীয় ক্রীড়াবিদদেরই— এই সত্যই ফের একবার প্রকাশ্যে এনে দিলেন পিভি সিন্ধু।
Leave a comment