শিলিগুড়ি: পুজো তো বটেই, এমনকি দীপাবলির মরশুমেও উত্তরবঙ্গের চা বলয়ের শ্রমিকদের জন্য বিরাট উপহার ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী! মঙ্গলবার শিলিগুড়ির প্রশাসনিক ভবন ‘উত্তরকন্যা’-য় আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক বৈঠকে চা বাগান শ্রমিকদের জন্য এককালীন পাঁচ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি রেশনের চালের পরিমাণ একলাফে ৩৫ কেজি থেকে বাড়িয়ে ৫০ কেজি করার ঐতিহাসিক ঘোষণা করেন তিনি।
পাশাপাশি, উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের জিইয়ে থাকা ক্ষত বন্ধ চা বাগানগুলি সচল করতে শ্রমমন্ত্রী অর্জুন সিংকে কড়া নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী চা শ্রমিক যোজনার আওতায় শ্রমিকদের সুদিন ফেরানোর জোরালো বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
উত্তরকন্যার বৈঠকে বড় ঘোষণা ও উপহার
পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার দুপুরে শিলিগুড়িতে পৌঁছে উত্তরকন্যায় উত্তরবঙ্গের সার্বিক উন্নয়নমূলক কাজকর্মের অগ্রগতি খতিয়ে দেখতে এক প্রশাসনিক বৈঠকে বসেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পাহাড়ি অঞ্চলের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ও অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় চা বাগান ও শ্রমিকদের দুর্দশা দূর করা যে তাঁর সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার, তা এদিন স্পষ্ট করে দেন তিনি।
বৈঠক শেষে চা শ্রমিকদের জন্য একগুচ্ছ বড় ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, কালীপুজো ও দীপাবলির প্রাক্কালে বাগানের প্রতিটি শ্রমিক পরিবারকে এককালীন ৫,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। শুধু তা-ই নয়, এতদিন শ্রমিকরা রেশনে যে ৩৫ কেজি চাল পেতেন, তা বাড়িয়ে সোজা ৫০ কেজি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এমনকি সাধারণ রেশন গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে প্রতি মাসে চালের পরিমাণ ৫০ কেজিতে উন্নীত করার বিষয়টি রাজ্য সরকারের সক্রিয় চিন্তাভাবনার মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এই পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলেই রাজ্যের সাধারণ মানুষও অতিরিক্ত এই সুবিধার আওতায় আসবেন।
‘সব কাজ মুখ্যমন্ত্রী করলে হবে না!’ অর্জুন সিংকে কড়া বার্তা
উত্তরবঙ্গের অর্থনীতিতে রুগ্ন ও বন্ধ চা বাগান একটি দীর্ঘমেয়াদী অভিশাপ। পূর্ববর্তী তৃণমূল জমানায় একের পর এক বাগান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবন কাটাতে বাধ্য হয়েছিলেন। যদিও সেই সময় তৎকালীন সরকার বিনামূল্যে রেশন বা ‘চা সুন্দরী’ আবাসন প্রকল্পের মতো কিছু ব্যবস্থার চেষ্টা করেছিল, তবুও স্থায়ী সমাধান অধরাই থেকে গিয়েছিল।
এদিন উত্তরকন্যার বৈঠকে বন্ধ চা বাগানগুলির জট কাটানো নিয়ে চরম তৎপরতা দেখিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশে বসা শ্রমমন্ত্রী অর্জুন সিংকে উদ্দেশ্য করে রসিকতার সুরে অথচ অত্যন্ত কড়া ভাষায় তিনি বলেন, ‘‘আপনাকেই বন্ধ সমস্ত চা বাগান খুলতে হবে, সব কাজ তো আর মুখ্যমন্ত্রীর একা করলে চলবে না! আমি জানি, সামসিং ও আরও কয়েকটি বাগান ইতিমধ্যেই খুলে গিয়েছে। তবে বাকিগুলিও দ্রুত খুলতে হবে।’’
এর পরই উত্তরবঙ্গের চা শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘‘আপনারা নিজেদের জব কার্ড প্রস্তুত রাখুন, খুব দ্রুত কাজ শুরু হতে চলেছে। ‘প্রধানমন্ত্রী চা শ্রমিক যোজনা’র আওতায় সমস্ত শ্রমিককে নিয়ে আসা হবে।’’ রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পাহাড়ি জনপদের এই বহুদিনের সংকট মোচনে নতুন সরকারের এই পদক্ষেপে নতুন আশার আলো দেখছেন ডুয়ার্স ও পাহাড়ের শ্রমিক মহল।
কামতাপুরী সংগঠনের ডেপুটেশন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
মঙ্গলবার উত্তরকন্যাসংস্কারের এই বৈঠকে প্রশাসনিক কাজের মূল পর্যালোচনার পাশাপাশি অন্যান্য আঞ্চলিক দাবিদাওয়াও সামনে আসে। সূত্রের খবর, নিজেদের মাতৃভাষাকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও দাবি নিয়ে এদিন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন কামতাপুরী ভাষা সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তবে সরকারের শীর্ষস্তর থেকে এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বা পজিটিভ কোনো আশ্বাস বা ঘোষণা এসেছে কি না, সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি।
চা বাগানগুলিতে দীর্ঘ বঞ্চনা ও কর্মহীনতার জমানার অবসান ঘটিয়ে দীপাবলির আগে মুখ্যমন্ত্রীর এই আর্থিক প্যাকেজ ও চাল বাড়ানোর ঘোষণা যে উত্তরবঙ্গের রাজনীতি ও শ্রমিক মহলে এক বিরাট প্রভাব ফেলতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য। এখন দেখার, অর্জুন সিং ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে কত দ্রুত বন্ধ বাগানগুলোর চিমনি ফের ধোঁয়া ছাড়তে শুরু করে।
Leave a comment