মোথাবাড়ি: পৈত্রিক জমি এবং শত শত বিঘার প্রাচীন দেবোত্তর সম্পত্তি জবরদখলমুক্ত করতে গিয়ে ভয়াবহ রক্তাক্ত সংঘর্ষের সাক্ষী থাকল মালদহের মোথাবাড়ি। রবিবার দুপুরে মালদহের মোথাবাড়ি থানার হামিদপুর এলাকায় জমি সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের বিবাদের জেরে দুষ্কৃতীদের নৃশংস হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন এক ব্যক্তি। এই হামলায় গুরুতর জখম হয়েছেন সশস্ত্র সীমা বল (SSB) জওয়ান সহ মোট চারজন।
ঘটনার আকস্মিকতায় গোটা এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ ইতিমধ্যেই এই ঘটনায় জড়িত ২১ জনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলা রুজু করেছে এবং ১৩ জন অভিযুক্তকে আটক করেছে। তবে ঘটনার মূল অভিযুক্ত সনাতন মণ্ডল এখনও পলাতক রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, হামিদপুর এলাকার বাসিন্দা তথা পেশায় এসএসবি জওয়ান শশাঙ্ক শেখর যাদবের পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় কিছু অসাধু দুষ্কৃতীচক্রের জমি নিয়ে বিবাদ চলে আসছিল।
জওয়ানের অভিযোগ, তাঁদের পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া প্রায় ৫০ বিঘা উর্বর জমির পাশাপাশি কাছাকাছি এলাকায় প্রায় ৩০০ বিঘার একটি বিশাল দেবোত্তর সম্পত্তি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সেই দেবোত্তর সম্পত্তি এবং তাঁদের নিজস্ব জমির একটি বড় অংশ জোরপূর্বক জবরদখল করে রেখেছে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী দুষ্কৃতী।
জমিটি উদ্ধারের জন্য দীর্ঘদিন ধরে আইনগত লড়াইয়ের পাশাপাশি প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে ও স্থানীয় স্তরে একাধিকবার দরবার করেছিলেন এসএসবি জওয়ান শশাঙ্ক যাদব। কিন্তু বারবার আবেদন জানানো সত্ত্বেও কার্যকর কোনও পদক্ষেপ বা সুরাহা না মেলায় রবিবারে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে।
গত রবিবার দুপুরে জওয়ান শশাঙ্ক যাদব স্থানীয় কিছু কৃষককে সঙ্গে নিয়ে নিজের পৈত্রিক জমিতে চাষবাস করার উদ্দেশ্যে যান। অভিযোগ, তাঁরা জমিতে পৌঁছানোর মাত্র কিছুক্ষণ পরেই এলাকার চিহ্নিত দুষ্কৃতী সনাতন মণ্ডলের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র ও উগ্র লোক অতর্কিতভাবে তাঁদের ওপর চড়াও হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, হামলাকারীরা ইট, বাঁশ এবং ধারালো অস্ত্র নিয়ে জওয়ান ও কৃষকদের ওপর চড়াও হয়ে বেধড়ক মারধর শুরু করে। দুষ্কৃতীদের এলোপাথাড়ি মারধরের চোটে রক্তে ভেসে যায় চারপাশের জমি। এই বর্বরোচিত হামলায় গুরুতর জখম হন এসএসবি জওয়ান শশাঙ্ক শেখর যাদব, কৃষক শিবচরণ মণ্ডল (৫০), উজ্জ্বল মণ্ডল সহ মোট চারজন। হামলার পর পরই দুষ্কৃতীরা ঘটনাস্থল ছেড়ে পালিয়ে যায়।
রক্তাক্ত ও সংজ্ঞাহীন অবস্থায় স্থানীয় বাসিন্দারা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে আহতদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য সঙ্গে সঙ্গে মালদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা পরীক্ষা করার পর শিবচরণ মণ্ডলকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
অপর দুই গুরুতর আহত ব্যক্তি, এসএসবি জওয়ান শশাঙ্ক শেখর যাদব এবং কৃষক উজ্জ্বল মণ্ডল বর্তমানে মালদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁদের শারীরিক অবস্থাও যথেষ্ট আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে।
এই ত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। মোথাবাড়ি থানা থেকে বিশাল পুলিশ বাহিনী ও র্যাফ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসীর তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে পুলিশ তৎক্ষণাৎ কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এই ঘটনায় মোট ২১ জনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের একাধিক বিশেষ টিম ইতিমধ্যেই তল্লাশি চালিয়ে ১৩ জন অভিযুক্তকে আটক করেছে এবং তাদের জেরা করা হচ্ছে। তবে এই হামলার মূল মাস্টারমাইন্ড তথা প্রধান অভিযুক্ত সনাতন মণ্ডল ঘটনার পর থেকেই গা ঢাকা দিয়েছে এবং তার খোঁজে জোরদার তল্লাশি চালাচ্ছে মোথাবাড়ি থানার পুলিশ।
দিনের আলোয় জনবসতিপূর্ণ এলাকায় দেবোত্তর সম্পত্তি দখলকে কেন্দ্র করে এমন একটি খুনের ঘটনা এবং সশস্ত্র বাহিনীর জওয়ানের ওপর হামলার ঘটনায় রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, অবিলম্বে মূল অভিযুক্ত সনাতন মণ্ডলকে গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা না করলে বৃহত্তর আন্দোলনের পথে নামবেন তাঁরা। থমথমে হামিদপুর গ্রামে পুলিশি পাহারা জোরদার করা হয়েছে এবং পুরো ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শুরু করেছে মোথাবাড়ি থানার পুলিশ।
Leave a comment