•
Home Top-News Manikora Kali: ‘মানিককোড়া কালী’! ডাকাতদের পুজো থেকে আজকের জাগ্রত দেবী!
Top-Newsপশ্চিমবঙ্গ

Manikora Kali: ‘মানিককোড়া কালী’! ডাকাতদের পুজো থেকে আজকের জাগ্রত দেবী!

Share
শিল্পীর হাতে সাজছেন মা। নিজস্ব ছবি
Share

হবিবপুর: একসময়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার গভীর জঙ্গল। 

তার মাঝেই রাতের অন্ধকারে মশালের লালচে আলোয় দেবীর আরাধনায় বসত একদল দুর্ধর্ষ ডাকাত! পুজো শেষ করে সূর্য ওঠার আগেই পুনর্ভবা নদী পেরিয়ে যারা মিলিয়ে যেত নিজেদের ডেরায়। সময়ের হাত ধরে সেই অন্ধকার ও রোমহর্ষক অতীত আজ বহু দূরে সরে গেলেও, তার রেশটুকু রয়ে গিয়েছে অটুট। ডাকাতদের হাতে পূজিতা সেই দেবীই সময়ের বিবর্তনে আজ আপামর ভক্তের কাছে পরম আস্থার ঠিকানা মালদহের ‘মানিকোড়া কালী’!

প্রায় তিনশো বছরের প্রাচীন এই কালীপুজোকে ঘিরে আজও মালদহ জেলার হবিবপুর ব্লকের জাজইল গ্রাম পঞ্চায়েতের মানিকোড়া এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য গা-ছমছমে লোককাহিনি ও বিশ্বাস।

ডাকাতদের গোপন আরাধনা থেকে জমিদারের আবিষ্কার

স্থানীয় প্রবীণদের মুখে মুখে ফেরা প্রবাদপ্রতীম কাহিনি অনুযায়ী, প্রায় তিন শতাব্দী আগে বর্তমান বাংলাদেশের দিক থেকে পুনর্ভবা নদী পার হয়ে গভীর রাতে মানিকোড়ার ঘন জঙ্গলে আসত ডাকাত দল। নির্জন জঙ্গলে মশালের আলোয় মা কালীর পুজো সেরে তারা চম্পট দিত। পরবর্তী সময়ে ডাকাতদের উপদ্রব ও আনাগোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ব্রিটিশ আমলে স্থানীয় এক জমিদার শিকারে গিয়ে জঙ্গলের মধ্যে পরিত্যক্ত সেই পুজোর বেদি আবিষ্কার করেন।

এরপর সেই জমিদার পরিবারের উদ্যোগেই নতুন করে প্রাণ পায় দেবীর আরাধনা। বংশপরম্পরায় জমিদারদের হাত ধরে বহুকাল চলার পর জমিদারি প্রথার অবসান ঘটে। কিন্তু দেবীর পুজো বন্ধ হয়নি। এলাকার সর্বস্তরের গ্রামবাসীরা পুজোর দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেন। আর সেই থেকেই আজ অবধি গ্রামবাসীর সম্মিলিত উদ্যোগে মহাসমারোহে হয়ে আসছে এই ঐতিহ্যবাহী কালীপুজো।

আরও পড়ুন : শিয়ালদহ শাখায় বাম্পার উপহার! ৮ থেকে ১১ নভেম্বর চলবে ৬ জোড়া বিশেষ লোকাল ট্রেন, বদলাচ্ছে নৈহাটির রুট

বলির জোয়ার ও দেবীর মুখ ঢাকার রহস্য

সময় বদলালেও বদলায়নি মানিকোড়া কালীর পুজোর প্রাচীন রীতিনীতি। ডাকাত আমলের ঐতিহ্যকে ধরে রেখে আজও মশাল জ্বালিয়ে দেবীর আরাধনা করা হয়। শুধু তা-ই নয়, এই পুজোকে কেন্দ্র করে বসে এক বিশাল মেলা, যা প্রায় সাত দিন ধরে চলে। 

মালদহ তো বটেই, এ রাজ্য তথা ভিন রাজ্য থেকেও হাজার হাজার ভক্ত ছুটে আসেন মায়ের টানে। পুজো কমিটির সম্পাদক গৌতম ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, এই পুজোকে ঘিরে বহু প্রাচীন রোমহর্ষক গল্পকথা প্রচলিত রয়েছে। বর্তমানে গ্রামবাসীরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পুজোর সব দিক সামলান। পুজোর দিনগুলিতে রাতভর চলে পাঠাবলি। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিবছর এই পুজোয় প্রায় দুই হাজার পাঠা বলি দেওয়া হয়!

এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক চরম রহস্যময় লোককথাও। প্রবীণদের বিশ্বাস, পুজোর গভীর রাতে যখন চক্ষুদান ও পাঠাবলি সম্পন্ন হয়, তখন নাকি দেবীমূর্তি কেঁপে ওঠে এবং সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে! অতীতে এই অলৌকিক ঘটনা সামলাতে এবং মূর্তিকে সোজা রাখতে নাকি লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার প্রচলন ছিল। 

বর্তমান সময়ে সেই কড়াকড়ি না থাকলেও, এখনও চক্ষুদান ও পাঠাবলির বিশেষ সময়ে দেবীর মুখ কাপড়ে ঢেকে রাখার প্রাচীন প্রথা কঠোরভাবে মেনে চলা হয়। পুজোর দিন গোটা এলাকার বহু মানুষ নিরামিষ আহার করেন এবং পরিবারে যে কোনো শুভ অনুষ্ঠান শুরুর আগে মানিকোড়া কালীর আশীর্বাদ নেওয়া বাধ্যতামূলক বলে মনে করেন।

আরও পড়ুন: কালীপুজোর মুখে রাজ্যজুড়ে পুলিশি তৎপরতা!

বার্ষিক পুজো থেকে নবান্ন উৎসব

শুধু বার্ষিক দীপান্বিতা কালীপুজোই নয়, সারা বছর জুড়েই মানিকোড়া মন্দিরে নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়। পুজো কমিটির সহ-সম্পাদক তথা কোষাধ্যক্ষ চিরঞ্জিত শীল জানান, আষাঢ় মাসে মায়ের থানে ‘আষাঢ়ি পুজো’ অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানেও বলি প্রথার নিয়ম রয়েছে। 

পাশাপাশি, অগ্রহায়ণ মাসে নতুন ধান ঘরে তোলার ঠিক আগে মন্দিরে বিশেষ ‘নবান্ন পুজো’ হয়। মজার বিষয় হলো, মানিকোড়া মন্দিরে এই নবান্ন পুজো সম্পন্ন হওয়ার পরেই কেবল এলাকার মানুষ নিজেদের বাড়িতে নবান্ন উৎসব পালন করতে পারেন।

ডাকাতদের গোপন রাতের তান্ত্রিক আরাধনা থেকে আজকের সর্বজনীন ভক্তি ও লোকবিশ্বাসের মেলবন্ধন সুদীর্ঘ তিনশো বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে মানিকোড়া কালী। সমাজ বদলেছে, যান্ত্রিকতা গ্রাস করেছে চারপাশ, কিন্তু মালদহের এই জনপদে মাকে ঘিরে মানুষের অগাধ বিশ্বাস, আবেগ আর শিহরণ জাগানো রোমাঞ্চে এতটুকুও মরচে পড়েনি।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *