কলকাতা: আর একদিনের অপেক্ষা, তারপরেই আলোয় সেজে উঠবে গোটা দেশ। শুরু হয়ে যাবে সনাতন ধর্মের অন্যতম বড় উৎসব দীপাবলি। আলোর এই উৎসব মানেই আনন্দ, উল্লাস এবং অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে সুন্দরকে সাদর অভ্যর্থনা জানানো। কার্তিক মাসের এই বিশেষ চার দিনের উৎসবের প্রতিটি মুহূর্তের যেমন রয়েছে গভীর ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব, তেমনই প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যায় প্রদীপ জ্বালানোর রয়েছে এক অনন্য নিয়ম। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, ধনতেরাসে ঠিক ১৩টি কিংবা দীপাবলিতে ২১টি প্রদীপই কেন জ্বালানো হয়? এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে চমৎকার আধ্যাত্মিক ও জ্যোতিষশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা।
পঞ্জিকা মতে, কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে পালিত হয় ধনতেরাস। তিথির মাহাত্ম্য অনুসারে এই দিনটিতে ঠিক ১৩টি প্রদীপ জ্বালানোর প্রথা রয়েছে। এর মধ্যে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ নিয়ম হলো, প্রথম প্রদীপটি মৃত্যুর দেবতা যমরাজের উদ্দেশ্যে দক্ষিণ দিক মুখ করে প্রজ্বলন করতে হয়, যা পরিবারের সদস্যদের সমস্ত অশুভ শক্তি ও বিপদ থেকে রক্ষা করে বলে বিশ্বাস করা হয়। পাশাপাশি, স্বাস্থ্য, ধনদেবী মা লক্ষ্মী এবং কুবের দেবতাকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতেও এই প্রদীপগুলি দেওয়া হয়। প্রাচীন বিশ্বাস বলে, এই ১৩টি প্রদীপ মূলত বছরের ১৩টি চন্দ্র মাস কিংবা মানুষের ১৩টি প্রধান জীবনীশক্তির প্রতীক।
এর ঠিক পরের দিন অর্থাৎ ভূত চতুর্দশীতে বাড়িতে ১৪টি প্রদীপ জ্বালানোর নিয়ম রয়েছে। মনে করা হয়, এই বিশেষ রাতে আমাদের চৌদ্দ পুরুষের পূর্বপুরুষরা মর্ত্যে নেমে আসেন তাঁদের উত্তরসূরিদের আশীর্বাদ করতে। এই দিনে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করলে কোনো নেতিবাচক শক্তি কাছাকাছি ঘেঁষতে পারে না। এরপর আসে মূল দীপাবলি বা আমাবস্যার রাত, যেদিন ঘরে ঘরে ২১টি প্রদীপ জ্বালানোর রীতি প্রচলিত। এর পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট দার্শনিক ও তাত্ত্বিক কারণ। মানুষের শরীর বা প্রকৃতির মোট একুশটি প্রধান উপাদানের শুদ্ধিকরণ করতে এই সংখ্যাটি বেছে নেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়, পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয়, শরীরের ভেতরের পাঁচটি বায়ু, প্রকৃতির পাঁচটি মূল উপাদান বা পঞ্চভূত (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম) এবং একটি মন বা আত্মা। জ্যোতিষশাস্ত্রেও এই সংখ্যার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, যেখানে ২১-এর অঙ্কগুলির যোগফল অর্থাৎ ৩ হলো দেবগুরু বৃহস্পতির সংখ্যা। এই প্রদীপের পবিত্র আলো ও শুভ শক্তির প্রভাবে ঘরের সমস্ত বাস্তুদোষ কেটে গিয়ে ইতিবাচক শক্তির সঞ্চার হয়।
আরও পড়ুন: পুরনো দিল্লিতে মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়ল গোটা তিনতলা বাড়ি! ২ জনের মৃত্যু, ভেতরে আটকে অনেকে, যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ https://hiddenstories.news/2026/11/05/entire-three-storey-house-collapses-in-moments-in-old-delhi-2-dead-many-trapped-inside-rescue-operations-underway-on-war-footing/
পরবর্তী দিনগুলিতে অর্থাৎ ভাইফোঁটার দিন আবার ৫টি প্রদীপ জ্বালানোর নিয়ম রয়েছে, যা মানবদেহের পঞ্চপ্রান ও পঞ্চভূতের প্রতীক হিসেবে ভাইয়ের দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্য কামনা করে। শাস্ত্র মতে, মাটির তৈরি প্রদীপের আধার হলো আমাদের নশ্বর দেহ, তেল বা ঘি আমাদের কর্মের প্রতীক এবং তুলোর বাতিটি নির্দেশ করে আমাদের অহংকার ও আত্মাকে। প্রদীপের আলো জ্বেলে মানুষ যেমন তার শরীরের সমস্ত অজ্ঞানতা দূর করে জ্ঞানের আলোয় নিজেকে আলোকিত করে, তেমনই এই আচার গৃহস্থালির সমস্ত অন্ধকার ও নেতিবাচক শক্তি দূর করে মনকে শান্ত ও পবিত্র রাখে।
Leave a comment