কলকাতা: উপনির্বাচনে জোটের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হতেই জাতীয় কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র তোপ দাগলেন তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জোটের রাজনীতির রাস্তায় ইতি টেনে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, “ভবিষ্যতে সংসদের ভেতরে কিংবা বাইরে, জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে আর কোনও রাজনৈতিক সমঝোতা বা জোটে থাকবে না তৃণমূল কংগ্রেস।”
আগামী ৬ অক্টোবর রাজ্যের দুই হাইভোল্টেজ বিধানসভা কেন্দ্র নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে উপনির্বাচন। সম্প্রতি ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুর ও নন্দীগ্রাম, দুই কেন্দ্রেই জয়ী হয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। নিয়ম অনুযায়ী একটি আসন ছাড়তে হওয়ায় তিনি নন্দীগ্রাম কেন্দ্রটি ফাঁকা করেন। অন্যদিকে, রেজিনগর ও নওদা আসনে জয়ী আম জনতা উন্নয়ন পার্টির হুমায়ুন কবীর রেজিনগর আসনটি ছেড়ে দেওয়ায় সেখানেও উপনির্বাচন নির্ধারিত হয়।
বিজেপিকে রুখতে উপনির্বাচনের ঠিক মুখে হাত শিবিরের দিকে সমঝোতার হাত বাড়িয়েছিলেন কালীঘাট তৃণমূল নেত্রী। রাজনৈতিক সূত্রের খবর, সোমবার সন্ধ্যায় নাটকীয়ভাবে এআইসিসির (AICC) সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপালকে নিজে ফোন করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রস্তাব ছিল, নন্দীগ্রাম আসনটি কংগ্রেসকে ছেড়ে দিতে প্রস্তুত কালীঘাট তৃণমূল, প্রয়োজনে প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে তৃণমূল প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে-র নামও। বিনিময়ে রেজিনগরে কালীঘাট তৃণমূলের প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরীকে যেন পূর্ণ সমর্থন জানায় কংগ্রেস।
তবে কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্ব মমতার সেই সমীকরণ একবাক্যে খারিজ করে দেয়। কে সি বেণুগোপাল তৃণমূলের এক সাংসদকে জানিয়ে দেন, স্থানীয় স্তরে বাংলার কংগ্রেস কর্মীরা এই জোটের প্রস্তাব মানতে একেবারেই নারাজ। দলের এই পদক্ষেপে ক্ষোভ উগরে দিয়ে তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় পাল্টা কটাক্ষ করে বলেন, “কংগ্রেস যদি শুধুমাত্র তাদের স্থানীয় নেতাদের কথায় চলে, তবে সংসদেও তাদের সঙ্গে একযোগে চলার কোনও বাধ্যবাধকতা তৃণমূলের নেই।”
প্রদেশ কংগ্রেস অবশ্য অতীত অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে এই সিদ্ধান্তের কথা স্পষ্ট করেছে। ২০১১-র পর জোট ভেঙে বেরিয়ে যাওয়া এবং অতীতে কংগ্রেস কর্মীদের ওপর অত্যাচারের ইতিহাসের কথা তুলে ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'স্বার্থপর মাস্টারস্ট্রোক'-কে ব্যর্থ করে দিয়েছে হাত শিবির। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার অত্যন্ত কড়া সুর চড়িয়ে জানান, “জোট যদি করতেই হয়, তবে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর, দুই আসনেই কালীঘাট তৃণমূল আগে কংগ্রেস প্রার্থীদের নিঃশর্ত সমর্থন ঘোষণা করুক। সেখান থেকেই শুরু হোক। তা হলেই ভবিষ্যতে জোটের রাস্তা খোলা যাবে, না হলে নয়।”
উল্লেখ্য, ইতিমধ্যেই নন্দীগ্রামে ভূমি আন্দোলনের নেতা মিলন প্রধান ও রেজিনগরে জেলা পরিষদের সদস্য মহম্মদ আবদুল্লাহিল কাফিকে প্রার্থী করে ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচারে নেমে পড়েছে কংগ্রেস। রেজিনগরে শুভঙ্কর সরকারকে পাশে নিয়ে কাফির মনোনয়ন জমা দেওয়ার ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে কংগ্রেস নিজের অবস্থানে সম্পূর্ণ অনড়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে কালীঘাট তৃণমূল বনাম ঋতব্রতপন্থী তৃণমূলের আড়াআড়ি বিভাজন এবং প্রার্থী নিয়ে তীব্র অসন্তোষের কারণেই ব্যাকফুটে চলে যান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিশেষ করে ২০১৪ সালের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিতে নাম জড়ানো সঞ্চিতা প্রধান দে-কে নন্দীগ্রামে প্রার্থী করায় রাজনৈতিক চাপ বাড়ে তৃণমূলের উপর।
আর সেই কারণেই নন্দীগ্রাম আসন কংগ্রেসকে ‘উপহার’ দিয়ে রেজিনগর বাঁচানোর যে নজিরবিহীন কৌশল তৃণমূল নেত্রী নিয়েছিলেন, তা কংগ্রেসের প্রত্যাখ্যানের ফলে চূড়ান্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। উল্টে ঋতব্রতপন্থী তৃণমূল নন্দীগ্রামে এহতাশামুল হক এবং রেজিনগরে সফিউজ্জমান শেখকে দাঁড় করানোয় তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন চরম আকার ধারণ করেছে।
অন্যদিকে, বিজেপিও দুই আসনেই জোরকদমে লড়াইয়ে নেমেছে। নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর প্রয়াত আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথের স্ত্রী হাসিরানি রথ এবং রেজিনগরে শাখারফ সরকারকে প্রার্থী করেছে পদ্ম শিবির। উপনির্বাচনের এই আকস্মিক 'ডি-ট্যুর' বা বিপরীত মেরুতে হাঁটার ব্যর্থ চেষ্টার পর বঙ্গ রাজনীতির সমীকরণ এখন পুরোপুরি বদলে গেল। একের পর এক দুর্নীতি, ঘরোয়া কোন্দল এবং জাতীয় কংগ্রেসের স্পষ্ট 'না'-এর মুখে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত হাত শিবিরের ওপর চূড়ান্ত ক্ষোভ উগরে দিয়ে লড়াইয়ের ময়দানে একলা চলার পথই বেছে নিলেন মমতা।

বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন