নয়াদিল্লি: চারপাশেই রাজধানীর সবচেয়ে জমজমাট ও ব্যস্ততম এলাকা।
সামান্য দূরেই পদ্মমন্দির, পাশেই ঐতিহ্যবাহী ইসকন মন্দির, নেহরু প্লেসের বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং লেডি শ্রীরাম (এলএসআর) কলেজের মতো প্রথম সারির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সেই আলো ঝলমলে এলাকার কেন্দ্রস্থলেই দেড়শো একরের এক বিস্তীর্ণ পার্ক যেন পরিণত হয়েছে চরম অন্ধকারে ঢাকা ভূতুড়ে জঙ্গলে।
আর এই সরকারি গাফিলতি ও নিরাপত্তার কঙ্কালসার চেহারার সুযোগ নিয়েই দক্ষিণ দিল্লির কালকাজি এলাকার আস্থা কুঞ্জ পার্কে এক কিশোরীকে দীর্ঘ ৪০ মিনিট ধরে গণধর্ষণের অভিযোগ উঠল। পুলিশ জানিয়েছে, গত সোমবার সন্ধ্যায় এক পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে ওই পার্কে গিয়েছিল ওই নাবালিকা। সে সময়ই তিন দুষ্কৃতী নিজেদের পুলিশকর্মী পরিচয় দিয়ে তাদের পথ আটকায়, ভয় দেখায় এবং পাশবিক অত্যাচার চালায়।
ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ তিন অভিযুক্তকেই গ্রেফতার করেছে। কিন্তু এই গণধর্ষণের নেপথ্যে রাজধানীতে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ দিল্লি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ডিডিএ) ও বিজেপি পরিচালিত পুরসভার সার্বিক নজরদারি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার চূড়ান্ত ব্যর্থতা নিয়ে রাজনৈতিক তোলপাড় শুরু হয়েছে।
অভিযোগের ভিত্তিতে সরজমিনে অনুসন্ধানে নেমে যে ভয়াবহ ছবি দেখা গেল, তা আধুনিক ভারতের রাজধানীর বুকে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভয়াবহ ফাঁককেই স্পষ্ট করে দেয়। প্রায় ১৫০ একর জুড়ে বিস্তৃত আস্থা কুঞ্জ পার্কের আটটি গেটের মধ্যে অন্তত চারটি সার্বক্ষণিক খোলা থাকে।
সেখানে যে কেউ অনায়াসে যাতায়াত করতে পারে। কিন্তু সূর্য ডোবার পরেই পার্কের ভেতরটা নিমেষে বদলে যায় আস্ত এক নির্জন ঘন জঙ্গলে। সুবিশাল এই পার্কের বিস্তীর্ণ এলাকায় আলো জ্বালার মতো ন্যূনতম পরিকাঠামোটুকু নেই। অধিকাংশ আলোই বন্ধ বা ভাঙা।
ফলে দূরের পদ্মমন্দির থেকে আসা হালকা আলোটুকুই কেবল অন্ধকার পার্কের কিছু জায়গায় আলো-আঁধারির পরিবেশ তৈরি করে। যে কেন্দ্রীয় নগরোন্নয়ন মন্ত্রক তথা কেন্দ্র সরকার দেশের রাজধানীর নিরাপত্তার ঢাকঢোল পেটায়, তাদের নাকের ডগাতেই এই উদাসীনতা কী ভাবে দিনের পর দিন বজায় রইল? সেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন সাধারণ মানুষ।
ঘটনার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন লেডি শ্রীরাম কলেজের ছাত্রীরা। বুধবার ক্যাম্পাস সংলগ্ন এলাকায় এক বিশাল প্রতিবাদ ও সংহতি মিছিল করেন তাঁরা। তাঁদের স্পষ্ট দাবি, ক্যাম্পাসের চারপাশে অবিলম্বে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করতে হবে। করতে হবে পুলিশের নিয়মিত টহলদারির ব্যবস্থা। এবং চরম নিরাপত্তা ত্রুটি দূর করতে হবে।
কারণ, ঘটনার পরেই অভিযুক্তদের একজনকে ধরতে গিয়ে কলেজ গেটের কাছেই পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেই আতঙ্কে পরদিনই কলেজ কর্তৃপক্ষ সমস্ত ক্লাস অনলাইনে স্থানান্তরিত করতে বাধ্য হয়েছিল।
এখন ধৃত আসিফ, হেমন্ত ও মুকেশের গ্রেফতারির পর মামলা হয়ত এগবে। কিন্তু ক্ষুব্ধ রাজধানীবাসীর প্রশ্ন অন্য জায়গায়। কেন্দ্রের অধীনস্থ ডিডিএ এবং দিল্লির প্রশাসনিক চালিকাশক্তিতে থাকা বিজেপির চরম গাফিলতিতেই কি তবে এই ধরনের বিশাল জনবহুল এলাকার পার্কগুলো দুষ্কৃতীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হচ্ছে?
প্রতিদিন সন্ধ্যার পর নিরাপত্তার চরম ঝুঁকির মুখোমুখি হয়ে কত হাজার মানুষ এই খোলা গেট দিয়ে যাতায়াত করেন, আর সরকারি উদাসীনতার কারণেই কি এক কিশোরীর জীবন এভাবে ছারখার হয়ে গেল? কেন্দ্রের অধীনস্থ দিল্লি পুলিশ এবং পুর প্রশাসনের জবাবদিহিতা এড়ানোর জায়গা আর থাকছে না।
বিষয় : HiddenStoriesNews

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন