নয়াদিল্লি ও কলকাতা: স্বায়ত্তশাসিত সাংবিধানিক সংস্থা জাতীয় নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) অন্দরেই কি এ বার চরম বিভাজন স্পষ্ট? এক সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিকের খবরকে হাতিয়ার করে বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, ফাঁস হয়ে গিয়েছে কমিশন ও বিজেপির ষড়যন্ত্র। বাংলাকে নির্বাচন ফিরিয়ে দিতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ও কার্যকলাপ নিয়ে বাকি দুই নির্বাচন কমিশনার, সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশীর লিখিত অসন্তোষের খবর প্রকাশ্যে আসতেই তোলপাড় শুরু হয়েছে জাতীয় রাজনীতিতেও। এসআইআর (বিশেষ নিবিড় সংশোধন) বা ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া ঘিরে কমিশনের আড়াআড়ি ভাগ এখন কেন্দ্র-বিরোধী সংঘাতের সলতে পাকিয়ে দিয়েছে।
একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিগত ১০ মাসে ভোটার তালিকায় তথ্য কেন্দ্রীকরণ এবং নির্দিষ্ট 'ফর্ম-৬' সংশোধন-সহ অন্তত ১৪টি বিষয়ে লিখিত আপত্তি নথিভুক্ত করেছেন দুই নির্বাচন কমিশনার।
১৯৬০ সালের ভোটার নথিভুক্তকরণ নিয়মে সংশোধন না এনে 'ফর্ম-৬'-এ রদবদল করাকে 'আইনবহির্ভূত' ও 'অনুমোদনহীন' বলেও অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসাও এই বিষয়ে সওয়াল করে জানান, কমিশনের একাংশের আপত্তি সত্ত্বেও কী ভাবে সিদ্ধান্ত বলবৎ হল, তার পয়েন্ট-বাই-পয়েন্ট ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত। এমনকি জটিলতার কারণে এসআইআর-এর তৃতীয় পর্যায় বাতিল করারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই তীব্র সুর চড়িয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। ফেসবুক লাইভে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে অবিলম্বে গ্রেফতার করার দাবি তুলেছেন মমতা। তাঁর মারাত্মক অভিযোগ, এসআইআর-এর আড়ালাই বাংলায় প্রায় ৯২ লক্ষ বৈধ ভোটারের নাম অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার, ইভিএম কারচুপি এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসকের কার্যালয়ে অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়ে প্রমাণ লোপাটের মাধ্যমে নির্বাচন 'হাইজ্যাক' করা হয়েছে। মমতার স্পষ্ট হুংকার, “জ্ঞানেশ কুমার ও বিজেপির জয়েন্ট ভেঞ্চারে বাংলার নির্বাচন লুট হয়েছে। অবিলম্বে বাংলায় নতুন করে নির্বাচন করাতে হবে।” যদিও মমতার এই অভিযোগকে আমল দিতে নারাজ রাজ্য বিজেপি সভাপতি ও রাজ্যসভায় বিজেপির সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর পাল্টা দাবি, রাজনৈতিক ভাবে এখন দেউলিয়া মমতা ও তৃণমূল। তাই এ সবে এখন কান দেওয়ার তেমন কোনও প্রয়োজন নেই।
চোখের চিকিৎসা করিয়ে বিদেশ থেকে ফিরেই কমিশনকে তোপ দেগেছেন তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কটাক্ষ, “বাংলার মানুষের চরম অভিশাপ লেগেছে বলেই আজ এই কারচুপি সর্বসমক্ষে চলে এসেছে। সাংবিধানিক পদে নিজেদের পছন্দের লোক বসিয়ে রাজনীতির পরিণতি খুব ভয়ংকর হবে।” পাশাপাশি বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র (INDIA) তরফেও সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ ও যৌথ আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
রাজধানী দিল্লিতেও এই ভোটার সংশোধনী নিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। প্রায় ৩৩ লক্ষাধিক ভোটারকে নোটিস পাঠানো হয়েছে গরমিলের অজুহাতে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, সেই তালিকায় রয়েছেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, লালকৃষ্ণ আডবানী, প্রাক্তন উপ-রাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড় এবং স্বয়ং নির্বাচন কমিশনার এস এস সান্ধু নিজে! কমিশনের অন্দরের খবর প্রকাশ হতেই একযোগে মোদী সরকারের কড়া সমালোচনা করেছেন বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী থেকে সমাজবাদী পার্টির সুপ্রিমো অখিলেশ যাদব।
বিরোধীদের পাশাপাশি আইনি জলঘোলাও শুরু হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে। কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত তিন সদস্যের প্যানেলের বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত মন্তব্য করেন, “যাঁরা ব্যাট করবেন, তাঁরাই যদি আম্পায়ার বেছে নেন, তবে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠবেই।” মামলাটি এখন বৃহত্তর সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
যদিও সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি। বিজেপি মুখপাত্র সম্বিত পাত্রের পাল্টা প্রশ্ন, “ভোটার ছাঁটাইয়ে বিজেপি লাভবান হলে সামসেরগঞ্জের মতো আসনে বা সিংহভাগ ছাঁটাই হওয়া কেন্দ্রে তৃণমূল জিতল কীভাবে?”
অন্যদিকে কমিশনের দাবি, বহুদলীয় সংস্থায় নীতিগত মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ারই অংশ এবং সমস্ত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমেই নেওয়া হয়েছে। তবে ভোটের মুখে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ইম্পিচমেন্ট ও গ্রেফতারির দাবিতে যেভাবে জাতীয় রাজনীতি সরগরম, তাতে দিল্লির মসনদের পাশাপাশি ব্যাকফুটে কমিশনও।
বিষয় : HiddenStoriesNews

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন