মুম্বই: ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম মেগা বাজেট এবং গ্র্যান্ড স্কেলের ছবি বলতে গেলে সবার আগে উঠে আসে পরিচালক নীতেশ তিওয়ারির ‘রামায়ণ’ (Ramayana)-এর নাম। রণবীর কাপুর (ভগবান রাম), সাই পল্লবী (মাতা সীতা) এবং যশ (রাবণ)-এর মতো হেভিওয়েট তারকাখচিত এই পৌরাণিক মহাকাব্যটি বড় পর্দায় দেখার জন্য যখন গোটা দেশ অধীর আগ্রহে দিন গুনছে, ঠিক তার দু’দিন আগে থেকেই বিতর্ক যেন ছবির পিছু ছাড়ছে না!
গত কয়েক বছর ধরে নানা জল্পনা, আইনি লড়াই, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের পুরোনো মন্তব্য এবং গান নিয়ে তীব্র সমালোচনার জেরে বক্স অফিসে নামার আগেই এক বিস্ফোরক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মহাকাব্যের মর্যাদা রক্ষা নাকি আধুনিকীকরণ? মুক্তির দোড়গোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এই ছবি ঘিরে তৈরি হওয়া একের পর এক বিতর্কের খতিয়ান একনজরে।
১. এ আর রহমানের সঙ্গীত ও কিউওয়ালির ছোঁয়া নিয়ে বিতর্ক
ছবির সবচেয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কটি তৈরি হয়েছে অস্কারজয়ী সঙ্গীত পরিচালক এ আর রহমানের মিউজিক কম্পোজিশন নিয়ে। ভগবান রামের অযোধ্যা প্রত্যাবর্তনের উদযাপনে তৈরি গান ‘মঙ্গল রং’ (Mangal Rang)-এ সুফি ঘরানার সুর ও কাওয়ালি ব্যবহার দেখে মোটেই সন্তুষ্ট হতে পারেননি ভক্তরা। সনাতন ধর্মের পবিত্র মহাকাব্যের মূল সারাংশ ও ঐতিহ্য নষ্ট করার অভিযোগ উঠেছে রহমানের বিরুদ্ধে। একইসঙ্গে রাবণ তাণ্ডব সিকোয়েন্সে ইলেকট্রনিক মিউজিকের ব্যবহার নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেছেন অনেকে।
আরও পড়ুন: ১০ বছর, সাড়ে চার হাজার কোটি! দীপাবলির আগে নীতেশের ‘রামায়ণে’র অপেক্ষা
যদিও সমালোচনার মুখে পড়ে অ্যাপল প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবসের একটি উক্তি ধার করে রহমান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “সবাইকে সন্তুষ্ট করতে চাইলে আইসক্রিম বিক্রি করতে যান!” তিনি জানান, দীর্ঘ কয়েকমাস ধরে গভীরভাবে ভেবেচিন্তেই এই সুরগুলো তৈরি করা হয়েছে এবং তিনি নিজেই নিজের প্রথম সমালোচক।
২. ভিএফএক্স ও এআই (AI) বিতর্ক এবং যশের আর্জি
ছবির টিজার মুক্তির পর থেকেই ভিজ্যুয়াল এফেক্টস (VFX) এবং অতিরিক্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের মান নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। ব্যাকগ্রাউন্ড ও বেশ কিছু ফ্রেমের মান নিয়ে নেটপাড়ায় ধেয়ে আসে নেতিবাচক মন্তব্য। পরিস্থিতি সামাল দিতে নির্মাতারা বিটিএস (BTS) ভিডিও প্রকাশ করলেও তাতে কাজ হয়নি।
শেষে খোদ ‘রাবণ’ অর্থাৎ দক্ষিণী সুপারস্টার যশ দর্শকদের কাছে আবেদন জানিয়ে বলেছেন, “ছোটখাটো ত্রুটি খুঁজে বেড়াবেন না। প্রযোজক নমিত মালহোত্রা নিজের সুনাম এবং সর্বস্ব বাজি রেখে গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মে এই ছবি তৈরি করেছেন। এই মুহূর্তে এ ধরনের বড় প্রচেষ্টাকে উৎসাহ না দিলে ভারতীয় সিনেমা আবার পিছিয়ে যাবে।”
৩. সাই পল্লবীর কাস্টিং ও ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন
মাতা সীতার চরিত্রে সাই পল্লবীর নির্বাচন ঘোষণার পর থেকেই শুরু হয় চুলচেরা বিশ্লেষণ। তাঁর গ্ল্যামার, অনস্ক্রিন উপস্থিতি, হিন্দি উচ্চারণ এবং চুল নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় চলে নানা বিতর্ক। এমনকি সীতার ব্লাউজের ডিজাইন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে সঠিক কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন পোশাক পরিকল্পনাকারী রিম্পল ও হরমপ্রীত।
পাশাপাশি, অতীতে ধর্মীয় সহিংসতা নিয়ে সাই পল্লবীর করা একটি পুরোনো সাক্ষাৎকার নতুন করে ভাইরাল হওয়ায় তাঁকে নিয়ে বয়কটের ডাক দেয় উগ্রপন্থী গোষ্ঠী।
৪. রণবীরের ‘বিফ ফ্যান’ কমেন্ট ও ডায়েট বিতর্ক
ভগবান রামের চরিত্রে রণবীর কাপুরের কাস্টিং নিয়ে আপত্তি তুলেছে একটি বড় অংশ। ২০১১ সালের একটি পুরোনো সাক্ষাৎকার খুঁচিয়ে বের করা হয়, যেখানে রণবীর নিজেকে ‘বিফ ফ্যান’ বা গরুর মাংসের অনুরাগী বলে দাবি করেছিলেন। এরপর ছবির প্রচারে তাঁর ‘সাত্ত্বিক ডায়েট’ ও ধর্মীয় ভাবমূর্তির প্রচার দেখে দ্বিমুখী আচরণের অভিযোগ তোলে নেটিজেনরা। প্রচারের স্বার্থে মিথ্যা ধার্মিক ভাবমূর্তি তুলে ধরার জন্য ক্ষমা চাওয়ার দাবিও উঠেছে।
৫. করিনা কাপুরের পারিশ্রমিক বিতর্ক ও দীপিকার মন্তব্য
ছবির শুরুর দিকে সীতা চরিত্রের জন্য করিনা কাপুর খানের দ্বিগুণ পারিশ্রমিক চাওয়ার গুঞ্জন রটলেও, পরে তা স্রেফ মিডিয়ার গল্প বলে উড়িয়ে দেন স্বয়ং করিনা। অন্যদিকে, ১৯৮৭ সালের আইকনিক ‘রামায়ণ’-খ্যাত সীতা অর্থাৎ দীপিকা চিখলিয়া প্রথমে বারবার নতুন রিমেক তৈরির সমালোচনা করলেও, নীতেশ তিওয়ারির ছবির গ্র্যান্ড টিজার দেখে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
৬. মুকেশ ছাবরার ‘রাবণ প্রেম’ মন্তব্য ও আইনি জটিলতা
ছবির কাস্টিং ডিরেক্টর মুকেশ ছাবরা এক পডকাস্টে মন্তব্য করেছিলেন, “রাম এবং রাবণ দুজনেই নিজের জায়গায় সঠিক ছিলেন, দুজনেই প্রেমে ছিলেন।” রাবণের কুকীর্তিকে প্রেমের মোড়ক দেওয়ায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে পরে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন তিনি।
অন্যদিকে, ছবির স্ক্রিপ্ট নিয়ে ‘মধু মন্তেনা’র প্রযোজনা সংস্থার কপিরাইট দাবি এবং ট্রেলারের ফুটেজ লিক হওয়ার ঘটনায় বম্বে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় নির্মাতারা। আদালত ছবিটির পাইরেসি ও অবৈধ স্ট্রিমিং রুখতে কড়া নির্দেশিকা জারি করেছে। পাশাপাশি, ‘আদিপুরুষ’ ছবির মতো বিতর্ক এড়াতে শ্রী রামনিষ্ঠা ও রামলীলা মহাসের্ঞ্জের পক্ষ থেকে বিশেষ স্ক্রিনিংয়ের দাবি ও প্রচ্ছন্ন হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।
এত বিতর্ক, প্রতিবাদ আর আইনি জট পেরিয়ে আগামী দু’দিনে বক্স অফিসে কতটা আলোড়ন তুলতে পারে নীতেশ তিওয়ারির এই বহুল আলোচিত ‘রামায়ণ’, এখন সেটাই দেখার!
Leave a comment