মুম্বই: প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবার রূপালি পর্দায় ইতিহাস সৃষ্টির পালা।
বিশ্ব সিনেমার মানচিত্রে ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্য ও মহাকাব্যিক গল্পকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিতে আগামী ৫ নভেম্বর, দীপাবলির ঠিক প্রাক্কালে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেতে চলেছে পরিচালক নীতেশ তিওয়ারির বহু প্রতীক্ষিত ও বর্হিসর্বস্ব ম্যাগনাম ওপাস ‘রামায়ণ’।
রণবীর কাপুর, সাই পল্লবী এবং যশ অভিনীত এই প্রজেক্টটি তৈরির নেপথ্যে রয়েছে প্রায় এক দশকের স্বপ্ন, সাধনা এবং অদম্য জেদ। শোনা যাচ্ছে, ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সর্বাধিক অর্থাৎ ৪,০০০ কোটি টাকারও বেশি (প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার) আকাশছোঁয়া ও অবিশ্বাস্য বাজেটে নির্মিত হয়েছে এই দুই পর্বের মেগা ফ্র্যাঞ্চাইজি। বিশ্ববাসীর সামনে প্রাচীন ভারতকে জীবন্ত করে তোলার এই মহাযজ্ঞে ভারতীয় সংস্কৃতির সুবাস এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এমন মেলবন্ধন এর আগে দেখেনি সিনেরসিকরা।
ছবির অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে সম্প্রতি একটি বিশেষ পোস্ট শেয়ার করে লেখা হয়েছে, ‘‘দশ বছরের আকাঙ্ক্ষা। সর্বকালের সেরা মহাকাব্যটিকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার অবিচল সংকল্প। বিশ্বের সেরা কিছু প্রতিভার সহযোগিতায় রামায়ণকে যাতে সর্বোচ্চ সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে উপস্থাপন করা যায়, তারই এক ঐতিহাসিক ফলাফল। নতুন সূচনার শুটআউট শুরু হলো। আসুন, রাম বনাম রাবণের এই অমর উপাখ্যানকে উদযাপন করি। আমাদের সত্য, আমাদের ইতিহাস।’’
পরিচালক ও নির্মাতাদের সূত্রে জানা গেছে, সিনেমাটিকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে এবং এর চিত্রনাট্যকে আধুনিক দর্শকের বোধগম্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে নীতেশ তিওয়ারি এবং প্রযোজক নমিত মালহোত্রা বিশদে ‘বশিষ্ট যোগ শাস্ত্র’ অধ্যয়ন করেছেন। এমনকি দেশের বিশিষ্ট পন্ডিত ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে দফায় দফায় পরামর্শ করে ভারতীয় দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রূপালী পর্দায় ধারণ করা হয়েছে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে দীর্ঘ দশ বছর ধরে এই প্রজেক্টটি বাস্তবায়িত হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পরিচালক নীতেশ তিওয়ারি জানান, মূল উৎস অর্থাৎ মহর্ষি বাল্মীকি রচিত রামায়ণের কাঠামোর সঙ্গে কোনও রকম আপস না করেই অন্যান্য আঞ্চলিক ও লোককথার প্রায় ৩০০-রও বেশি সংস্করণে ছড়িয়ে থাকা সুন্দর গল্পগুলোকে একত্রিত করতে দীর্ঘ সময় লেগেছে।
আরও পড়ুন: দূষণমুক্ত দেওয়ালির বার্তা দিয়ে বিপাকে দিয়া মির্জা! বিজেপি-র আপত্তিতে ভিডিও সরাল বিএমসি
পরিচালক বলেন, ‘‘আমাদের দেশে রামায়ণের তিনশোরও বেশি সংস্করণ রয়েছে। প্রতিটি সংস্করণের নিজস্ব সুন্দৰ কিছু চরিত্র ও বিবরণ রয়েছে। আমরা এমন একটি সর্বগ্রাসী ও নিখুঁত সংস্করণ বেছে নিতে চেয়েছিলাম, যা ছোটবেলা থেকে আমাদের সকলের ভালোবাসার সেই মহাকাব্যের প্রতি পূর্ণ ন্যায়বিচার করে এবং একই সঙ্গে গোটা বিশ্বকে গর্বের সঙ্গে উপহার দেওয়ার মতো এক নিখুঁত সিনেমাটিক স্পেকট্যাকল তৈরি করে।’’
ছবির ভিএফএক্স (VFX) এবং টেকনিক্যাল কাজের পেছনে কতটা রক্ত-ঘাম ঝরেছে, তারও এক রোমহর্ষক বিবরণ দিয়েছেন নীতেশ। তিনি জানান, ছবিতে রাবণ ও জটায়ুর মধ্যকার বহুল চর্চিত যুদ্ধদৃশ্যটি নিখুঁত করে তুলতে কেবল ভিজ্যুয়াল আর্টিস্টদের প্রায় সাড়ে ছয় বছর সময় লেগেছে। শুধু তাই নয়, পৌরাণিক কাহিনীর অত্যন্ত আকর্ষণীয় কল্পনার বস্তু ‘পুষ্পক বিমান’-এর চূড়ান্ত রূপরেখা ঠিক করতেই নির্মাতাদের প্রায় দু’বছর সময় ব্যয় করতে হয়েছে। বিমানটির ওড়ার পিছনে নির্দিষ্ট কোনো ‘বিজ্ঞানসম্মত’ ভিত্তি বা লজিক থাকতে হবে, যাতে আধুনিক দর্শকের কাছেও তা বিশ্বাসযোগ্য ঠেকে— এই ভাবনা থেকেই প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি ভিন্ন ডিজাইনের রূপ পরিবর্তন করে তবেই চূড়ান্ত নকশাটি বেছে নেওয়া হয়।
অন্যদিকে, হলিউডের বাঘা বাঘা বিগ বাজেট ছবিকে টেক্কা দিয়ে গ্লোবাল মার্কেটে এই ছবিকে পৌঁছে দেওয়ার প্রসঙ্গে প্রযোজক নমিত মালহোত্রা বলেন, ‘‘ছয়-সাত বছর আগে যখন আমরা এই ছবি তৈরির কথা ভেবেছিলাম, তখন অনেকেই আমাকে পাগল ভেবেছিলেন। কারণ এই স্কেলের কোনো ছবি ভারতে এর আগে কেউ কল্পনাও করেনি। বাজেট প্রায় ৪ হাজার কোটির ওপরে হলেও আমরা অহেতুক টাকা ওড়ানোর বদলে অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও সুপরিকল্পিতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ছবিটির কাজ সম্পন্ন করেছি। আমাদের লক্ষ্য ভারত থেকে বিশ্বের জন্য একটি মাস্টারপিস উপহার দেওয়া।’’
তবে কোটি কোটি টাকার ভিএফএক্স ও চোখধাঁধানো সেট তৈরি হলেও ছবির আবেগগত মূল ভিত্তি যাতে হারিয়ে না যায়, সে বিষয়ে প্রথম থেকেই চূড়ান্ত সতর্ক ছিলেন নির্মাতারা। নমিত মালহোত্রার মতে, ‘‘রামায়ণ আদতে নৈতিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং গভীর মানবিক আবেগের এক চিরন্তন দলিল।’’
আর পরিচালক নীতেশ তিওয়ারির কণ্ঠেও সেই একই সুর, চরিত্রগুলোর চারপাশের চাকচিক্য যতই জাঁকজমকপূর্ণ হোক না কেন, পর্দার পাত্র-পাত্রীদের মানসিক অভিযাত্রার সঙ্গে দর্শকের হৃদয়ের সংযোগটাই এখানে সর্বেসর্বা। দীপাবলির ঠিক আগে এই মহাকাব্যিক দৃশ্যকাব্য দেখার জন্য এখন থেকেই চরম উত্তেজনায় ফুটছেন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সিনেমাপ্রেমীরা।
Leave a comment