ঢাকা: চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে সামনে পেলেই জয়ের ধারা বজায় রাখার সেই চেনা ছবিটা আজও বদলাল না। তবে, সহজ জয় হাত ফসকে প্রায় বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। বৃহস্পতিবার ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের (SAFF Championship 2026) উদ্বোধনী ম্যাচে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে ৩-২ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত সূচনা করল ভারতের অনূর্ধ্ব-২৩ ফুটবল দল।
ম্যাচের প্রথম ৩২ মিনিটেই তিন গোল করে প্রতিপক্ষকে কার্যত দিশাহারা করে দিয়েছিল ‘মেন ইন ব্লু’। কিন্তু ম্যাচের একদম শেষলগ্নে অতিরিক্ত সময়ে পরপর দু’গোল হজম করে বসল নৌশাদ মুসার দল। শেষ মুহূর্তে গোলরক্ষক অর্শ শেখের বীরত্বে কোনও রকমে জয় রক্ষা পেলেও, শেষ মুহূর্তের এই রক্ষণ-বিভ্রাট কোচের কপালে যে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলল, তা বলাই বাহুল্য।
সুহেলের জোড়া গোল ও রোনাল্ডোর ‘সিউউউ’ সেলিব্রেশন
আইএসএল এবং ফ্রেন্ডলি ম্যাচের ব্যস্ততার কারণে এই টুর্নামেন্টে দেশের প্রথম সারির তারকারা অনুপস্থিত। সম্পূর্ণ তরুণ এবং আনকোরা দল নিয়েই মাঠে নেমেছিল ভারত। অধিনায়ক বিজয় ভার্ঘিজের নেতৃত্বে ৪-৩-৩ ছকে শুরু থেকেই পাকিস্তানের রক্ষণভাগে ত্রাসের সঞ্চার করে ভারতীয় দল।
ম্যাচের শুরু থেকেই আগ্রাসী মেজাজে খেলতে থাকে ব্লু টাইগাররা। ১৩ মিনিটে ডেডলক ভাঙেন ২১ বছরের কাশ্মীরি ফরোয়ার্ড সুহেল আহমেদ ভাট। মহম্মদ সুহেলের নিখুঁত পাস ধরে পাক গোলরক্ষক ইউসুফ ইজাজ ভাটকে কার্যত বোকা বানিয়ে ডান পায়ের জোরালো শটে বল জালে জড়িয়ে দেন মোহনবাগানের এই স্ট্রাইকার। গোল করার পরেই মাঠের কোণে ছুটে গিয়ে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর সিগনেচার ‘সিউউউ’ সেলিব্রেশনে মেতে ওঠেন সুহেল।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশে পা দিয়ে চূড়ান্ত অপমান! সাফ ফুটবল খেলতে গিয়ে ঢাকায় ঘর পেলেন না ভারতীয় ফুটবলাররা
এই গোলের রেশ কাটতে না কাটতেই ছ’মিনিটের মাথায় ফের গোল! ১৯ মিনিটে সতীর্থের নিখুঁত থ্রু পাস ধরে পাকিস্তানের ডিফেন্স চিরে বক্সের বাঁ দিক দিয়ে ঢুকে ঠান্ডা মাথায় নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন সুহেল। হ্যাটট্রিকের সুযোগও তৈরি করেছিলেন তিনি, তবে বেশ কয়েকটি সুযোগ নষ্ট হয়।
এর পর ৩২ মিনিটে নওফল পিএনের বাড়ানো বল ধরে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে স্কোরলাইন ৩-০ করে দেন মিডফিল্ডার মাংলেনথাং কিপগেন। প্রথমার্ধেই ৩-০ গোলে এগিয়ে থেকে ম্যাচের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নিয়েছিল ভারত।
পেনাল্টি মিস পাকিস্তানের, দ্বিতীয়ার্ধে মন্থর ছন্দ
খেলার ধারার বিপরীতে ৩৪ মিনিটে ম্যাচে ফেরার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল পাকিস্তান। অভিষেক সূর্যবংশীর ফাউলে বক্সে পেনাল্টি পায় তারা। কিন্তু স্পট-কিক থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন পাক ফরোয়ার্ড শায়েক দোস্ত। তাঁর দুর্বল শট ক্রসবারের উপর দিয়ে উড়ে চলে যায়।
প্রথমার্ধের দাপটের পর দ্বিতীয়ার্ধে এসে খেলার গতি কিছুটা কমিয়ে দেয় ভারতীয় দল। ৬০ মিনিটে জোড়া গোলদাতা সুহেল ও অন্য ফুটবলারদের তুলে নিয়ে বেঞ্চ থেকে নতুন মুখ নামান কোচ নৌশাদ মুসা। মাঠে পাক ফুটবলারদের মধ্যে চোট-আঘাতের সমস্যাও দেখা যায়।
হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন আব্দুল রহমান। এর পরেও কিপগেন, অভিষেকরা ব্যবধান বাড়ানোর একাধিক সুযোগ পেলেও প্রতিপক্ষের রক্ষণ ও গোলরক্ষকের কল্যাণে তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
অন্তিম লগ্নে পাক-ঝড় ও চরম নাটক
৮৯ মিনিট পর্যন্ত স্কোরবোর্ডে ভারতের একচ্ছত্র দাপট থাকলেও ম্যাচের শেষ কয়েক মিনিটে পুরো দৃশ্যপট বদলে যায়। স্টপেজ টাইমের ঠিক শুরুতেই, অর্থাৎ ৯০+১ মিনিটে জুনেইদ শাহের ভাসানো ক্রস থেকে দুর্দান্ত হেডে ব্যবধান কমান পাক ফরোয়ার্ড নাজিব উল্লাহ।
এর ঠিক তিন মিনিট পরেই (৯৪ মিনিটে) ম্যাককিল আবদুল্লার ক্রস থেকে ডান পায়ের জোরালো ভলিতে বল জালে জড়িয়ে দেন বিকল্প হিসেবে নামা আলমগির গাজি। আচমকা জোড়া গোল খেয়ে ভারতীয় শিবিরে তখন মারাত্মক ত্রাসের সঞ্চার। ৯০+৫ মিনিটে পাকিস্তানের ম্যাককিলের দূরপাল্লার আরেকটি শট রুখে দিয়ে দলের জয় নিশ্চিত করেন গোলরক্ষক অর্শ শেখ।
শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়লেও, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে টানা ২১ বছর অপরাজিত থাকার রেকর্ড অক্ষুণ্ণ রাখল ভারত। তবে ৩ গোলে এগিয়ে থেকেও ম্যাচের শেষ মুহূর্তে যেভাবে পরপর দু’গোল হজম করল দল, তাতে আগামী ম্যাচগুলিতে নামার আগে রক্ষণভাগের এই মারাত্মক দুর্বলতা নিয়ে কঠোর হোমওয়ার্ক করতে হবে কোচ নৌশাদ মুসাকে।
Leave a comment