কলকাতা: বাংলায় রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এবার পূর্বতন সরকারের আমলের যাবতীয় অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকড় টেনে বের করতে নজিরবিহীন পদক্ষেপ করল নতুন সরকার। গত ১৫ বছর ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনে রাজ্যে ঠিক কী কী আর্থিক কেলেঙ্কারি ও প্রশাসনিক অব্যবস্থা হয়েছে, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘মন্ত্রিগোষ্ঠী’ বা মন্ত্রিসভার সাব-কমিটি গঠন করেছে শুভেন্দু অধিকারী-সরকার। বৃহস্পতিবার নবান্নে আয়োজিত ক্যাবিনেট বৈঠকে এই বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রের মনমোহন সিং জমানার ‘গ্রুপ অফ মিনিস্টার্স’ (GoM)-এর ধাঁচেই তৈরি এই শক্তিশালী কমিটির শীর্ষে রাখা হয়েছে রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তকে। কমিটিতে সদস্য হিসেবে থাকছেন শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়-সহ আরও দুই হেভিওয়েট মন্ত্রী, যা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে বিগত সরকারের আমলনামা হাতড়াতে কতটা মরিয়া নবান্ন।
বৃহস্পতিবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে স্থির হয়েছে যে, এই বিশেষ কমিটি মূলত পাঁচটি মূল বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে একটি প্রামাণ্য সরকারি দলিল বা ‘শ্বেতপত্র’ তৈরি করবে। এই তালিকায় সবার প্রথমে রয়েছে বিগত জমানার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অভূতপূর্ব অবনতি, তোলাবাজি ও সিন্ডিকেট রাজের দাপট। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা, পুরসভা, স্বরাষ্ট্র এবং সমবায়-সহ সমস্ত সরকারি দপ্তরের নিয়োগ দুর্নীতির চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হবে। তৃতীয়ত, বিগত সরকারের অন্যতম বড় আয়োজন বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনের (BGBS) নামে হওয়া প্রকৃত খরচের হিসাব খতিয়ে দেখা হবে। চতুর্থ ক্ষেত্রে রয়েছে রাজ্যের ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, বিশেষ করে আরজি কর হাসপাতালের নারকীয় ঘটনায় যে প্রশাসনিক ব্যর্থতা বেআব্রু হয়েছিল, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত। আর সবশেষে, খোদ নবান্নের ১৪ তলা অর্থাৎ শীর্ষ স্তরের মদতপুষ্ট সামগ্রিক প্রশাসনিক অনিয়মের খতিয়ান টেনে বের করবে এই কমিটি।
রাজনৈতিক পরিভাষায় শ্বেতপত্র বা ‘White Paper’ হলো এমন এক প্রামাণ্য দলিল, যার মাধ্যমে কোনও নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রকৃত তথ্য ও পরিসংখ্যান জনগণের সামনে আনা হয়। তাত্ত্বিকভাবে এটি স্বচ্ছতার প্রতীক হলেও, ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন সরকার আসার পর পূর্বতন সরকারের ব্যর্থতাকে জনসমক্ষে এনে ব্যাকফুটে ঠেলে দিতে একে অত্যন্ত কৌশলগত রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অতীতে ১৯৪৮ ও ১৯৫০ সালে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের দেশীয় রাজ্য অন্তর্ভুক্তির ঐতিহাসিক দলিল থেকে শুরু করে ২০২৩ সালে তেলেঙ্গানার কংগ্রেস সরকার কিংবা ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে মোদী সরকারের আনা ইউপিএ জমানার ‘পলিসি প্যারালাইসিস’-এর শ্বেতপত্র এর বড় উদাহরণ। ক'দিন আগেই বিধানসভায় অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত আর্থিক অনিয়ম নিয়ে শ্বেতপত্র আনার কথা বললেও, এদিনের ক্যাবিনেট বৈঠকের পর স্পষ্ট যে, শুধু আর্থিক খতিয়ান নয়, প্রশাসনিক দুর্নীতি থেকে নারী নিরাপত্তা ও আরজি কর কাণ্ড—সবকিছুকেই আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে এক বড়সড় আইনি ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে চলেছে শুভেন্দুর নতুন মন্ত্রিসভা।

শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুলাই ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন