নয়াদিল্লি: স্বায়ত্তশাসিত সাংবিধানিক সংস্থা নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) অন্দরেই কি এ বার বড়সড় ফাটল চওড়া হতে শুরু করল? একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিকের সাম্প্রতিক এক বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই তোলপাড় শুরু হয়েছে জাতীয় রাজনৈতিক মহলে।
কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ও কাজকর্মে দুই নির্বাচন কমিশনার, সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী একাধিকবার লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। অভিযোগের তির সরাসরি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের দিকে।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে মোদী সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে একযোগে সুর চড়িয়েছে কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, শিবসেনা (উদ্ধব গোষ্ঠী) ও ডিএমকে-সহ সমস্ত প্রধান বিরোধী দলগুলি। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অপসারণ ও ইম্পিচমেন্টের (অভিযোগ আনা) দাবি তুলে আক্রমণ হানছে বিরোধী শিবির।
প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, বিগত ১০ মাসে ভোটার তালিকায় তথ্য কেন্দ্রীকরণ এবং নির্দিষ্ট 'ফর্ম-৬' পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত-সহ অন্তত ১৪টি বিষয়ে লিখিত অনাস্থা বা আপত্তি নথিভুক্ত করেছেন ওই দুই কমিশনার।
১৯৬০ সালের ভোটার নথিভুক্তকরণ নিয়মে নির্দিষ্ট সংশোধন না এনে হুট করে 'ফর্ম-৬'-এ পরিবর্তন আনাকে 'আইনবহির্ভূত' এবং 'অনুমোদনহীন' বলেও তারা উল্লেখ করেন বলে খবর। কমিশনার সান্ধু পরবর্তীতে জানান, বিরোধিতা সত্ত্বেও সেই পরিবর্তনগুলি প্রত্যাহার করা হয়নি।
বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য কেন্দ্রীয় কমিশন যে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া চালাচ্ছে, তা মূলত নির্দিষ্ট শ্রেণির ভোটারদের ছাঁটাই করে শাসকদল বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ারই এক সূক্ষ্ম চক্রান্ত।
ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন শিবসেনা (উদ্ধব) নেতা সঞ্জয় রাউত। তিনি বলেন, "যে ভাবে বিরোধী ভোট ছাঁটাই করে গণতন্ত্রের বারোটা বাজানো হচ্ছে, তা এক কথায় অপরাধ। ইতিহাস কিন্তু কাউকে ক্ষমা করবে না। বর্তমান সিইসি পদে বহাল থাকা অবস্থায় দেশে কোনও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়।"
একই সুরে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও'ব্রায়েন অতীতে দেওয়া সিইসি-র ইম্পিচমেন্ট মোশন ফের স্মরণ করিয়ে দিয়ে এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেলে লেখেন, "গণতন্ত্র বাঁচাতে অবিলম্বে সিইসি-কে ইম্পিচ বা অপসারিত করা হোক।"
কংগ্রেস নেতা মণীশ তিওয়ারি এবং সপা প্রধান অখিলেশ যাদবও কমিশনকে 'শাসকের পুতুল' বলে কটাক্ষ করেছেন। ডিএমকে-র তরফে দাবি করা হয়েছে, বিশেষ ভোটার সংশোধনের নামে কমিশন এক চরম প্রহসন চালাচ্ছে।
এমনকি স্বয়ং রাজধানী দিল্লিতেই ভোটারদের কাছে পাঠানো নোটিস ঘিরে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। প্রায় ৩৩ লক্ষাধিক ভোটারকে নোটিস পাঠানো হয়েছে ২০০২ সালের পুরনো ভোটারের তথ্যের সঙ্গে গরমিল থাকার অজুহাতে।
তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, যাঁদের নোটিস পাঠানো হয়েছে তাঁদের তালিকায় রয়েছেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, প্রাক্তন উপ-প্রধানমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবাণী, প্রাক্তন উপ-রাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড় এবং খোদ নির্বাচন কমিশনার এস এস সান্ধু নিজে!
যদিও নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ সূত্রের তরফে গোলমালের সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিশনের এক আধিকারিক জানান, কোনও কমিশনারই লিখিতভাবে 'ভিন্নমত' বা 'ডিজেন্ট' প্রকাশ করেননি।
কমিশনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত-সহ এসআইআর চালুর প্রক্রিয়া, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং দুই নির্বাচন কমিশনারের সই ও সর্বসম্মতিক্রমেই গৃহীত হয়েছে। যা করা হয়েছে, তা কেবলই প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণ বা নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। তবে কমিশনের অন্দরের এই দ্বন্দ্বে ভোটের মুখে বিরোধীদের হাতে যে এক নতুন অস্ত্র উঠে এল, তা অস্বীকার করছেন না রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
বিষয় : HiddenStoriesNews

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন