কলকাতা: প্রতিবছরের মতো এবারও দুর্গাপুজোর প্রাক্কালে ঘনিষ্ঠবৃত্তের নেতাকর্মী ও পরিচিতদের উপহার পাঠিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে কালীঘাট তৃণমূলের অন্দরে এবার সেই উপহার কেন্দ্র করেই বাঁধল তুমুল গৃহকন্দল। মহাষষ্ঠীর ভোর হতেই পোশাক নিয়ে দলের একদল যুব নেতার দেখনদারি এবং অন্যদলের তীব্র অসন্তোষে তোলপাড় শুরু হয়েছে কালীঘাটের অন্দরে। মমতার থেকে ‘প্রিয় গোপাল বিষয়ী’র শাড়ি ও পাজামা-পাঞ্জাবি উপহার পেয়ে ছাত্র-যুব শিবিরের নতুন মুখরা আহ্লাদে আটখানা হয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি পোস্ট করতেই রে-রে করে উঠেছেন জেলা ও শীর্ষ নেতৃত্ব।
দলের সাম্প্রতিক বিপর্যয় ও ভাঙনের পর হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাড়ি ঘিরে ওঠা নতুন মুখদের অনেকেই এবার প্রথম ‘দিদির আশীর্বাদ’ হিসেবে পুজোর জামাকাপড় পেয়েছেন। মমতার ঘনিষ্ঠ যুবনেত্রী উপাসনা চৌধুরী কিংবা অরূপ চৌধুরীর মতো নতুন মুখেরা সেই উপহারের ছবি ফেসবুকে লাল-সবুজ হৃদয় চিহ্ন জুড়ে পোস্ট করে প্রচার শুরু করেন। কিন্তু সেই পোস্ট দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তেই প্রকাশ্যে চলে আসে তৃণমূলের অন্দরের গভীর অভিমান ও ক্ষোভ। জেলায় যেখানে দলের বহু কর্মী ঘরছাড়া, কাজ হারিয়ে দিশেহারা এবং একাধিক মিথ্যা মামলায় জর্জরিত, সেখানে মমতার বাড়ির ঘনিষ্ঠ নেতাদের এমন বিলাসিতা ও পোস্ট দেওয়াকে ‘অসংবেদনশীল’ এবং ‘বালখিল্য আচরণ’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন প্রবীণরা।
দক্ষিণবঙ্গের এক ক্ষুব্ধ বিধায়কের কথায়, “শুধু ভালো বক্তৃতা দিলেই রাজনীতি হয় না, এই ধরনের শিশুসুলভ চপলতায় অবিলম্বে দিদির লাগাম টানা উচিত।” একই সুরে হুগলির এক নেত্রী আক্ষেপ করে প্রশ্ন তুলেছেন, “দিদি তো অনেককেই শাড়ি উপহার দিয়েছেন, তাই বলে এভাবে ঢাক পিটিয়ে নেটপাড়ায় বলতে হবে?” এমনকি জেলা থেকেও একের পর এক কড়া প্রতিক্রিয়া এবং ফোন আসতে শুরু করেছে কলকাতার নেতাদের কাছে। সাধারণ কর্মীদের ফেসবুক ওয়ালেও উপচে পড়ছে আক্ষেপের সুর। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে বুঝে শেষমেশ দুপুরেই আসরে নামতে হয় বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষকে। তিনি সোশ্যাল বার্তায় মনে করিয়ে দেন, উৎসবের আনন্দে মেতে উঠলেও সহকর্মীদের প্রতি ন্যূনতম সহানুভূতি যেন হারিয়ে না যায়।
তৃণমূলের একাংশের মতে, রাজনীতিতে ভাবমূর্তিই আসল কথা। তৃণমূলের কঠিন সময়ে যখন কর্মীরা মামলা ও টানাটানির সঙ্গে লড়াই করছেন, তখন কালীঘাটের ঘনিষ্ঠদের এমন পোশাকের হাটে মার্কেটিং শুধুই রুচিহীন নয়, চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার প্রমাণ। উপহার দেওয়া নিয়ে দলটির কারও আপত্তি না থাকলেও, যেভাবে তা নেটমাধ্যমে প্রদর্শন করা হয়েছে, তা বহু দিনের পুরনো ও অভাবী কর্মী-নেতাদের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে। ষষ্ঠীর সকালে উপহারের বহর আর তা নিয়ে দেখনদারি যে ভাঙা তৃণমূলের চিড়কে আরও চওড়া করে দিল, তা একপ্রকার স্পষ্ট।

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ অক্টোবর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন