নয়াদিল্লি: লোকসভার সেমিফাইনালে ডেটলাইন তৈরি করে ফেলল বিজেপি।
আগামী বছর পড়লেই পাঁচ রাজ্যের সঙ্গে ভোট হবে, দেশের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশে। সেই মিশনে নরেন্দ্র মোদীকে সামনে রেখেই ঝাঁপাতে চলেছে বিজেপি। পদ্ম শিবির থেকে যা ইঙ্গিত, তাতে যোগী রাজ্যে প্রচার শুরু হবে দীপাবলি কাটলেই।
২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল কোন রাজনৈতিক শক্তির অনুকূলে যাবে, তার মোক্ষম আগাম পূর্বাভাস মিলতে চলেছে ঠিক পরের বছর অর্থাৎ ২০২৭ সালে হতে চলা উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে।
আসন সংখ্যার নিরিখে দেশের বৃহত্তম এই রাজ্যটির বিধানসভা ভোটকে তাই নিছক রাজ্যস্তরের লড়াই বলে না দেখে তাকে ‘লোকসভার সেমিফাইনাল’ হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে ধাক্কা খাওয়ার পর এবার উত্তরপ্রদেশের গদি হাতছাড়া করতে নারাজ গেরুয়া শিবির।
আর সেই লক্ষ্যেই দীপাবলি কাটতেই দিওয়ালির রেশ ফুরানোর আগেই প্রচারের ময়দানে ঝড় তুলতে ঝাঁপিয়ে পড়তে চলেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং দলের সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন।
বিজেপি সূত্রে খবর, চলতি নভেম্বর এবং আগামী ডিসেম্বর মাস জুড়েই উত্তরপ্রদেশ জুড়ে এক অত্যন্ত সুসংগঠিত ত্রিস্তরীয় প্রচারের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ নিজের মতো করে প্রচারের কাজ শুরু করে দিলেও এবার পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার সুর বাঁধতে মাঠে নামছে হাইকম্যান্ড। প্রচারের মূল মুখ হিসেবে যথারীতি সামনে রাখা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকেই। মোদী, শাহ এবং নবীন কে, কোথায় এবং কীভাবে প্রচারের দায়িত্ব সামলাবেন, তার সুনির্দিষ্ট ব্লু-প্রিন্টও তৈরি হয়ে গিয়েছে।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মূলত মেগা সভা এবং বড় জনসভার ওপর জোর দেবেন। উত্তরপ্রদেশের ১৮টি প্রশাসনিক বিভাগের প্রত্যেকটিতে অন্তত একটি করে বিশাল জনসভা করার কথা রয়েছে তাঁর। তুলনায় কিছুটা ছোট আকারের ও ফোকাসড সভা করবেন অমিত শাহ, যিনি প্রধানত বুথ স্তরের সাংগঠনিক শক্তি ও শৃঙ্খলার ওপর কড়া নজর রাখবেন।
অন্যদিকে, বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন সরাসরি বিধানসভা কেন্দ্র ধরে ধরে প্রচারে নেতৃত্ব দেবেন এবং প্রতিটি আসনে দলের সাংগঠনিক কাজকর্ম ও রেশনিং কেমন চলছে, তা তদারকি করবেন। আর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ জেলাওয়ারি ঝোড়ো প্রচার চালিয়ে রাজ্যের প্রতিটি কোণ এবং প্রতিটি বিধানসভা আসনকে স্পর্শ করার পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা তৈরি করেছেন।
চলতি সপ্তাহেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে আলোর উৎসবের মরশুম। ধনতেরস ও দীপাবলির আনন্দ মিটলেই আগামী ২০ নভেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারে নেমে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পদ্মশিবির। বিধানসভা ভোটের ঠিক মাস তিনেক আগে এই সাঁড়াশি প্রচারের মূল লক্ষ্য হল, তৃণমূল স্তরের নিচুতলার কর্মীদের চাঙ্গা ও উজ্জীবিত করা এবং উত্তরপ্রদেশের প্রতিটি বুথ ও এলাকার শেষ ভোটারের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়া।
দলের বুথকর্মীদের প্রতি কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাঁরা যেন নিজ নিজ এলাকার অন্তত ৫০টি বাড়িতে গিয়ে সরাসরি জনসংযোগ করেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলার পাশাপাশি পায়ে হেঁটে প্রচার, ছোট সভা এবং সাইবার দুনিয়া বা সমাজমাধ্যমের প্রচারেও সমানভাবে জোর দিতে বলা হয়েছে।
আরও পড়ুন: লালুর কাছে সনিয়া! জটের সলতে পাকানোর কাজ কি শুরু?
রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণও যথেষ্ট স্পষ্ট। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে এনডিএ শরিকদের হাত ধরে কেন্দ্রে তৃতীয়বারের মতো সরকার গড়তে সক্ষম হলেও, উত্তরপ্রদেশে বড়সড় ধাক্কা খেতে হয়েছিল বিজেপিকে।
সে রাজ্যের মোট ৮০টি লোকসভা আসনের মধ্যে মাত্র ৩৩টিতে জয়ী হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল তাদের। অন্যদিকে, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি (এসপি) একাই ৩৭টি আসনে জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল।
এমনকি খোদ অযোধ্যার রামমন্দির যে ফৈজাবাদ লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত, সেই ঐতিহাসিক আসনেও এসপির কাছে বড় ব্যবধানে পরাজয় স্বীকার করতে হয়েছিল বিজেপিকে। যদিও এর আগে ২০১৭ এবং ২০২২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশের মাটিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছিল গেরুয়া শিবির।
তবে ২০২২ থেকে ২০২৬ এই চার বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় গঙ্গা-গোমতী দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। ভোটার তালিকা সংশোধন তথা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে বড়সড় আন্দোলন শুরু করেছে বিরোধী দলগুলির জোট ‘ইন্ডিয়া’।
‘ভোটচুরি’র অভিযোগকে হাতিয়ার করে শুরু হওয়া এই রাজনৈতিক তরজায় ক্রমশ চড়ছে উত্তেজনার পারদ। এর মাঝেই গত রবিবার দিল্লির রামলীলা ময়দানের বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে সমাজবাদী পার্টি প্রধান অখিষেল যাদব হুংকার ছেড়ে দাবি করেছেন যে, ২০২৭ সালের নির্বাচনে বিজেপিকে উত্তরপ্রদেশ থেকে এমনভাবে উৎখাত করা হবে যে তাদের আর ফিরে আসার কোনো সুযোগ থাকবে না।
অখিলেশ যাদবের এই আক্রমণকে প্রকাশ্যে উড়িয়ে দিলেও, এসপি সুপ্রিমো যেভাবে দলিত, সংখ্যালঘু এবং অনগ্রসর সম্প্রদায়কে (PDA ফর্মুলা) পাখির চোখ করে নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক সুসংহত করার কৌশল নিয়েছেন, তা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তায় রয়েছে বিজেপির শীর্ষ মহল।
আর সেই কারণেই শুধু প্রশাসনিক বা সাংগঠনিক ভরসায় হাত গুটিয়ে বসে না থেকে এখন থেকেই ময়দানে নেমে পাল্টা রণকৌশল সাজাতে ব্যস্ত পদ্মশিবির। সব মিলিয়ে, ২০২৭-এর মহারণের আগে উত্তরপ্রদেশের রাজনৈতিক ক্রিজ এখন থেকেই চরম উত্তপ্ত।
Leave a comment