নয়াদিল্লি: জীবন বাঁচাতে যে চিকিৎসাটুকু প্রয়োজন, তার খরচ জোগাতে গিয়ে প্রতিমুহূর্তে হাঁসফাঁস করছেন দেশের কোটি কোটি মানুষ। উচ্চ রক্তচাপের একটি সামান্য পরীক্ষা, এক মাসের ডায়াবেটিসের ওষুধ কেনা কিংবা নিকটবর্তী হাসপাতালে পৌঁছানোর যাতায়াত খরচ!
এই অতি সাধারণ চিকিৎসা ব্যয়ও বর্তমানে বহু পরিবারের কাছে এক বিশাল অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ঢাকার প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এ প্রকাশিত এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) একটি সাম্প্রতিক রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন মানুষ কোথায় বসবাস করেন, কত তাঁর আয় এবং তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা কতখানি, বর্তমান সমাজব্যবস্থায় সেটাই নির্ধারণ করে দিচ্ছে তাঁর সুস্থ থাকার বা সঠিক চিকিৎসা পাওয়ার অধিকারটুকুও।
গত ২০ অক্টোবর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO)-র প্রকাশিত ওই আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যমান চরম সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের দিকটি জোরাল ভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র সম্প্রদায়গুলো হৃদরোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টের মতো মারণ রোগের কবলে পড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সঠিক রোগ নির্ণয় এবং সময়মতো চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রেও পদে পদে হাজারো বাধার প্রাচীরের মুখোমুখি হতে হয় এই প্রান্তিক মানুষগুলোকে।
আরও পড়ুন: গণপিটুনিতে রক্তের দাগ! বেতনবৃদ্ধির দাবিতে ঢাকায় শ্রমিক অসন্তোষ, নামল বিজিবি
বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশ গুলোতে এই সংকট আজ চরম আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান তুলে ধরে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সেখানে ডায়াবেটিস, ক্যানসার এবং হৃদরোগের মতো অসংক্রামক রোগগুলির মাধ্যমেই প্রায় ৭১ শতাংশ মানুষের মৃত্যু ঘটছে।
অথচ বিশ্বব্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট স্বাস্থ্যসেবা খরচের প্রায় ৭৯.৩১ শতাংশ অর্থই রোগীদের নিজেদের পকেট থেকে অর্থাৎ সরাসরি মেটাতে হয় (আউট-অফ-পকেট এক্সপেন্ডিচার)। ফলে সামান্য কোনো বড় রোগ ধরা পড়লেই সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠে।
হু-এর (WHO) গবেষণায় তথ্যে উঠে এসেছে, দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও গ্রামীণ এলাকার মানুষ আজও মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছেন। গ্রামীণ জনপদে বসবাসকারী মানুষের রক্তচাপ পরীক্ষা ও তার নিয়মিত চিকিৎসার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। অন্যদিকে, প্রান্তিক ও পিছিয়ে থাকা পরিবারের মহিলারা জরায়ু মুখের ক্যানসার (সার্ভিকাল ক্যানসার) স্ক্রিনিং বা পরীক্ষামূলক সুযোগ থেকে মারাত্মকভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন।
‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর ওই রিপোর্টে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, সাধারণ মানুষকে শুধু ‘স্বাস্থ্যকর খাবার খান, নিয়মিত ব্যায়াম করুন কিংবা সময়মতো ডাক্তার দেখান’, এই ধরনের গতানুগতিক পরামর্শ দিয়ে কখনোই দারিদ্র্য এবং সীমিত পরিকাঠামোয় শিকড় গেড়ে বসা গভীর স্বাস্থ্য সংকটের সমাধান করা সম্ভব নয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল রোগ প্রতিরোধ করাটাই চিকিৎসার অর্ধেক লড়াই। এর পাশাপাশি প্রতিটি মানুষের জন্য সুলভ মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসা নিশ্চিত করাও সমানভাবে জরুরি। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে এর অর্থ হল, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষার সুযোগ সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া, জীবনদায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধগুলির সহজলভ্যতা বজায় রাখা এবং কমিউনিটি স্তরে বা তৃণমূলের স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থাকে আরও অনেক বেশি শক্তিশালী করে তোলা।
পরিবারের চিকিৎসা কল্লাণ নিশ্চিত করতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আর্থিক সুরক্ষা। যাতে কোনও পরিবারকে কেবল চিকিৎসা বিল মেটানোর জন্য পেটের ভাত জোগাড় করা, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা সংসারের অন্য কোনও নিত্যপ্রয়োজনীয় মৌলিক প্রয়োজন বন্ধ করতে না হয়। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের উচিত কেবল দেশের জাতীয় গড়ের হিসেবের ওপর নির্ভর না করে, সমাজের ঠিক কোন প্রান্তিক সম্প্রদায়গুলো সুচিকিৎসার আলো থেকে পিছিয়ে পড়ছে, তা নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করা এবং সেই অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ করা।
পরিশেষে ওই প্রতিবেদনে জোরালোভাবে বলা হয়েছে যে, একটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রকৃত অগ্রগতি বা সাফল্য কখনোই কেবল ঝকঝকে নতুন হাসপাতাল তৈরি করা কিংবা মেঠো প্রচারের জন্য বড় বড় সচেতনতামূলক ক্যাম্পেন লঞ্চ করার মাপকাঠিতে মাপা যায় না। বরং তার আসল কৃতিত্ব লুকিয়ে রয়েছে সেই ব্যবস্থার মধ্যে, যেখানে সমাজের প্রতিটি মানুষ, তাঁর আয়, শিক্ষা বা বসবাসের ঠিকানা যাই হোক না কেন, একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সমান সুযোগ ও অধিকার পাবেন।
Leave a comment